উত্তরাখণ্ড: দেহের সন্ধান মিলেছে, কিন্তু সেগুলি উদ্ধার করে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উত্তরাখণ্ডের জোশীমঠে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার পর তিন দিন কেটে গেলেও ছ’জনের দেহ উদ্ধার করতে হিমশিম খাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। দুর্ঘটনাস্থল এতটাই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যে সেখানে পৌঁছনোর কোনও সড়কপথ নেই। খাড়া পাহাড়ি পথ ধরে পায়ে হেঁটেই এগোতে হচ্ছে উদ্ধারকারী দলকে। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং কঠিন ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধারকাজে বিলম্ব হচ্ছে। রবিবারও অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন।
শুক্রবার দুপুরে বদরীনাথ থেকে দেরাদুনের সহস্রধারা হেলিপ্যাডে ফেরার পথে ভেঙে পড়ে একটি বেসরকারি সংস্থার হেলিকপ্টার। জোশীমঠের কাছে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে ভেঙে পড়ে সেটি। কপ্টারে ছিলেন পাইলট-সহ মোট ছ’জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচ জনই কর্নাটকের বাসিন্দা। দুর্ঘটনায় কারও প্রাণ বাঁচেনি।
দুর্ঘটনার খবর পেয়েই উদ্ধারকাজে নামে সেনা, ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি), রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এসডিআরএফ), পুলিশ এবং জেলা প্রশাসনের দল। পরে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) এবং বন দফতরের কর্মীরাও অভিযানে যোগ দেন। কিন্তু দুর্ঘটনাস্থলের অবস্থান উদ্ধারকারীদের কাছে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাণ্ডুকেশ্বরের দিক থেকে পাহাড়ি পথ ধরে ধ্বংসাবশেষের কাছে পৌঁছতে হচ্ছে তাঁদের। দেহগুলি নিরাপদে নীচে নামিয়ে আনার জন্য বিকল্প পথও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চামোলির জেলাশাসক গৌরব কুমার জানিয়েছেন, উদ্ধারকাজের সঙ্গে যুক্ত সব সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে জেলা প্রশাসন। দ্রুত এবং নিরাপদে দেহগুলি উদ্ধার করে জোশীমঠে নিয়ে আসাই এখন প্রধান লক্ষ্য। উদ্ধারকারীদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনাস্থল থেকে নিকটতম সড়ক পর্যন্ত পৌঁছতেই কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন আধিকারিকেরা।
এই দুর্ঘটনার পরেই চারধাম যাত্রায় ব্যবহৃত হেলিকপ্টারগুলির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সেই প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তরাখণ্ড সিভিল অ্যাভিয়েশন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (ইউকাডা)। চারধাম যাত্রার রুটে চলাচলকারী হেলিকপ্টারে এ বার থেকে সহ-পাইলট রাখা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইউকাডা এবং অসামরিক বিমান পরিবহণের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ-র আধিকারিকদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, প্রতিটি উড়ানের পর পাইলটকে বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। সেই রিপোর্টে উড়ানের পথে আবহাওয়ার পরিস্থিতি, দৃশ্যমানতা এবং অন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করতে হবে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে ডিজিসিএ এবং বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত ব্যুরো (এএআইবি)-র প্রতিনিধিরাও জোশীমঠে পৌঁছেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে দুর্ঘটনার পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছেন তাঁরা। রবিবার দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য ও নমুনা সংগ্রহের কথা রয়েছে তাঁদের।
দুর্ঘটনার দিন ওই এলাকায় আবহাওয়া খারাপ ছিল কি না, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। আবহাওয়া দফতরের তরফে সতর্কতা জারি ছিল কি না এবং সেই পরিস্থিতিতে হেলিকপ্টার ওড়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কী ভাবে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইউকাডার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক প্রতীক জৈন জানিয়েছেন, ওই এলাকায় আবহাওয়া সংক্রান্ত সতর্কবার্তা ছিল। বিমান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল কি না, সেই বিষয়টি এখন তদন্তের আওতায়।
উত্তরাখণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিংহ ধামী ইতিমধ্যেই দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেছেন, এই কঠিন সময়ে শোকাহত পরিবারগুলির পাশে রয়েছে রাজ্য সরকার।
চারধাম যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থ বদরীনাথ। প্রতি বছর কয়েক মাসের জন্য হিমালয়ের দুর্গম পথে হাজার হাজার পুণ্যার্থী এই তীর্থে যান। তাঁদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য হেলিকপ্টার পরিষেবার উপর নির্ভরতা ক্রমশ বেড়েছে। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ায় এই পরিষেবার নিরাপত্তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। জোশীমঠের দুর্ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিল।




