নিউজ ডেস্ক: যেকোনও সাধারণ চাকরিতে যোগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় একটি সিভি (CV)। সেই সিভি সাধারণত এক থেকে দু’পাতার হয়। কর্মজীবন দীর্ঘ হলে কখনও কখনও তা কয়েক পৃষ্ঠারও হতে পারে। ২০২৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন। জানা গিয়েছে, এই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর সম্পূর্ণ কারিকুলাম ভিটা (Curriculum Vitae) বা সিভি এতটাই দীর্ঘ যে তা ২০০-রও বেশি পৃষ্ঠায় বিস্তৃত। এর সবচেয়ে বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে চার দশকেরও বেশি সময়ের বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাপত্র, প্রকাশনা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার তালিকা এবং পুরস্কারের বিবরণ।
এই মার্কিন বিজ্ঞানীর জন্ম বেলজিয়ামে। অ্যান্টার্কটিকায় আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি প্রতিষ্ঠা এবং মহাকাশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্তকরণে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি এ বছর নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে তিনি আইসকিউব প্রকল্পের প্রধান অনুসন্ধানকারী (প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর) এবং সহ-মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে আইসকিউবের সঙ্গে তাঁর গবেষণার সম্পর্ক আরও পুরনো। ১৯৮০-র দশকের শেষ দিক থেকেই দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো শনাক্ত করার ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি।
হ্যালজেনের দীর্ঘ সিভির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর অসংখ্য বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা। কণা পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা, বিশ্বতত্ত্ব এবং নিউট্রিনো গবেষণায় কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন তিনি। বিশেষ করে আইসকিউবের মতো বৃহৎ আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতায় প্রকাশিত বহু গবেষণাপত্রে তাঁর নাম রয়েছে।
আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণায় বৃহৎ আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক প্রকল্পগুলির প্রকাশনার তালিকা সাধারণ গবেষকদের তুলনায় অনেক দীর্ঘ হতে পারে। আইসকিউব সহযোগিতামূলক প্রকল্পে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শত শত বিজ্ঞানী যুক্ত রয়েছেন। ফলে এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকাশিত গবেষণাপত্র, সম্মেলনের কার্যবিবরণী এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক কাজের দীর্ঘ তালিকা হ্যালজেনের পূর্ণাঙ্গ সিভিকেও অস্বাভাবিকভাবে বড় করে তুলেছে।
তাঁর সিভিতে শুধু গবেষণাপত্রই নয়, শিক্ষাজীবন, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন, গবেষণায় নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক কমিটিতে কাজ এবং কয়েক দশকে অর্জিত পুরস্কারের বিবরণও রয়েছে।
হ্যালজেন ১৯৬৯ সালে বেলজিয়ামের কাথোলিকে ইউনিভার্সিটি লুভেন (KU Leuven) থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। এরপর ১৯৭১ সালে ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন–ম্যাডিসনে গবেষণা সহযোগী হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। কয়েক দশক ধরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি।
তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি। দক্ষিণ মেরুর প্রায় এক ঘনকিলোমিটার স্বচ্ছ বরফকে বিশাল কণা শনাক্তকারী যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এই অবজারভেটরি। বরফের গভীরে বসানো হয়েছে হাজার হাজার আলোকসংবেদনশীল ডিটেক্টর। উচ্চশক্তির কোনও নিউট্রিনো বিরলভাবে পদার্থের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করলে যে ক্ষীণ আলোর সংকেত তৈরি হয়, তা শনাক্ত করে বিজ্ঞানীরা কণাটির উৎস সম্পর্কে ধারণা পান।
নিউট্রিনো পদার্থের সঙ্গে খুব কম প্রতিক্রিয়া করে বলে সেগুলিকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। এই কারণেই অনেক সময় এগুলিকে ‘ঘোস্ট পার্টিকল’ বা ‘ভুতুড়ে কণা’ বলা হয়। আইসকিউবের মাধ্যমে মহাকাশ থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত হওয়ায় মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন একটি পথ খুলে গিয়েছে।
হ্যালজেন ১৯৮৮ সালের দিকে দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে এই ধরনের বিশাল নিউট্রিনো ডিটেক্টর তৈরির ধারণা সামনে আনেন। দীর্ঘ গবেষণা, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পর ২০১১ সালে আইসকিউবের নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ২০১৩ সালে অবজারভেটরিটি উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনোর গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ প্রকাশ করে, যা আধুনিক অ্যাস্ট্রোপার্টিকল ফিজিক্সে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
দীর্ঘ গবেষণাজীবনে হ্যালজেন একাধিক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে স্মিথসোনিয়ান আমেরিকান ইনজেনুইটি অ্যাওয়ার্ড, বালজান পুরস্কার, ইউরোপীয় ফিজিক্যাল সোসাইটির পুরস্কার, পন্টেকোরভো পুরস্কার এবং ব্রুনো রসি পুরস্কার।
২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার সেই দীর্ঘ তালিকায় অন্যতম বড় স্বীকৃতি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁর আইসকিউব-সংক্রান্ত গবেষণা এবং মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্তকরণে নেতৃত্বকে পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ‘২৩০ পৃষ্ঠার সিভি’ দাবিটিকে কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। হ্যালজেনের সরকারি ওয়েবসাইটে সত্যিই একটি অত্যন্ত দীর্ঘ পূর্ণাঙ্গ সিভি রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণও। পূর্ণাঙ্গ সংস্করণটি নিয়মিত আপডেট হওয়ায় সংস্করণভেদে এর পৃষ্ঠাসংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ২৩০ পৃষ্ঠাকে এর স্থায়ী পৃষ্ঠাসংখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
তার পরেও হ্যালজেনের সিভির অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে। এটি চাকরির জন্য তৈরি সাধারণ সিভি নয়, বরং অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের গবেষণা, প্রকাশনা এবং বৈজ্ঞানিক নেতৃত্বের পূর্ণাঙ্গ নথি। কয়েক পৃষ্ঠার কর্মজীবনের পরিচয়ের পরিবর্তে এটি যেন একজন বিজ্ঞানীর দীর্ঘ গবেষণাজীবনের লিখিত ইতিহাস।





