নিজেই বলেছিলেন, ‘‘৫০০ টাকা ঘুষ দিতে খুব খারাপ লেগেছিল’’। বছর কয়েক পরে সেই পুরনো ভিডিয়োই যেন ফিরে এল অন্য এক প্রশ্ন নিয়ে। ছত্তীসগঢ় ক্যাডারের ২০২২ ব্যাচের IPS আধিকারিক রাহুল বনশালের বিরুদ্ধে উঠেছে এক কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার ও নেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগটি একটি সাইবার প্রতারণার মামলা মিটিয়ে দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত। আর সেই অভিযোগ সামনে আসতেই সমাজমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর পুরনো মক-ইন্টারভিউয়ের ভিডিয়ো।
বিষয়টি পৌঁছেছে দিল্লির বিশেষ CBI আদালতে। আদালত ছত্তীসগঢ়ের পুলিশ মহানির্দেশক এবং CBI ডিরেক্টরের কাছে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, তার রিপোর্ট চেয়েছে। রাহুলের সঙ্গে আরও দুই পুলিশকর্মীর নামও অভিযোগে রয়েছে—অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর প্রবীণ কুমার রাঠৌর এবং কনস্টেবল অংশুল শর্মা।
যে ৫০০ টাকার গল্প এখন ভাইরাল
IPS হওয়ার অনেক আগে, সিভিল সার্ভিসের প্রস্তুতির সময়ে একটি মক ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন রাহুল। সেখানেই তাঁকে সরকারি দফতরে দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। উত্তরে নিজের পরিবারের একটি অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি।
রাহুলের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর ভাই তখন IIT কানপুরে পড়তেন। আমেরিকায় একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপনের জন্য যাওয়ার আগে তাঁর দ্রুত জন্মের শংসাপত্র প্রয়োজন ছিল। সেই শংসাপত্র তাড়াতাড়ি পাওয়ার জন্য এক পঞ্চায়েত আধিকারিক তাঁদের কাছে ৫০০ টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেন রাহুল।
শেষ পর্যন্ত সেই টাকা দিতে হয়েছিল। আর মক ইন্টারভিউতে সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে রাহুল জানিয়েছিলেন, মাত্র ৫০০ টাকা ঘুষ দিতে হলেও তাঁর ‘খুব খারাপ’ লেগেছিল। সরকারি পরিষেবা পেতে ঘুষ দেওয়ার এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল বলে জানান তিনি।
শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, ওই সাক্ষাৎকারে প্রশাসনের দুর্নীতি ও অদক্ষতা নিয়েও কথা বলেছিলেন রাহুল। তাঁর বক্তব্য ছিল, কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত বা অদক্ষ কর্মীর জন্য গোটা ব্যবস্থাকে দায়ী করা যায় না। একই সঙ্গে পুলিশ ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনের কথাও বলেছিলেন তিনি।
এ বার অভিযোগ এক কোটি টাকার
সেই রাহুলই এখন একেবারে ভিন্ন কারণে আলোচনায়। অভিযোগ, ছত্তীসগঢ়ে কর্মরত অবস্থায় একটি সাইবার প্রতারণার মামলা মিটিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে রাহুল এবং দুই পুলিশকর্মী মিলে এক কোটি টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন এবং নিয়েছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, পুরো এক কোটি টাকা একবারে দেওয়া হয়নি। দুই দফায় ৫০ লক্ষ টাকা করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগকে ঘিরেই দিল্লির বিশেষ CBI আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন অভিযোগকারী। আদালত বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে Action Taken Report চেয়েছে।
অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ ঘটনাটি রাহুলের প্রথম দিকের পোস্টিংয়ের সময়কার। তিনি ছত্তীসগঢ় ক্যাডারের ২০২২ ব্যাচের IPS আধিকারিক।
পুরনো ভিডিয়ো, নতুন বিতর্ক
অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরই পুরনো মক-ইন্টারভিউয়ের ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ফের ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ৫০০ টাকার ঘুষ নিয়ে যিনি নিজের অস্বস্তির কথা বলেছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধেই এখন এক কোটি টাকার ঘুষের অভিযোগ—এই বৈপরীত্যই ভিডিয়োটিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে।
হিসাব করলে, ১ কোটি টাকা ৫০০ টাকার ২০ হাজার গুণ। ফলে পুরনো বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান অভিযোগের তুলনা টেনে সমাজমাধ্যমে নানা মন্তব্য শুরু হয়েছে। কিন্তু এখানেই আইনি সতর্কতার জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ—অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। আদালতের নির্দেশে তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের পরই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে চূড়ান্ত ছবি স্পষ্ট হবে।
এই মুহূর্তে তাই গল্পের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ‘৫০০ থেকে ১ কোটি’ নয়। প্রশ্ন হল—সরকারি ব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে আদর্শের কথা এক জন ভবিষ্যৎ আমলা বলেন, ক্ষমতার বাস্তব পরিসরে পৌঁছে সেই আদর্শ কতটা অটুট থাকে? রাহুল বনশালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবে।