স্পোর্টস ডেস্ক: ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব সামলানো যে মোটেই সহজ নয়, তা স্বীকার করে নিলেন গৌতম গম্ভীর। তিন ধরনের ক্রিকেটে জাতীয় দলের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে মানসিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন তিনি। একের পর এক সিরিজ, টানা সফর, ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের চাপ এবং প্রতিটি ম্যাচে জয়ের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে। তবে সেই চাপ সামলানোর ক্ষমতা তাঁর রয়েছে বলেই জানিয়ে দিলেন ভারতের প্রধান কোচ। স্পষ্ট বললেন, যত দিন সম্ভব এই দায়িত্বের চাপ নিতে তিনি প্রস্তুত। প্রয়োজনে দেশের জন্য ‘বুলেট’ খেতেও রাজি।
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষে সাংবাদিক বৈঠকে নিজের মনের কথা জানান গম্ভীর। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তিন ধরনের ক্রিকেটে ভারতীয় দলের কোচিং করাতে গিয়ে কখনও মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত বোধ করেন কি না। উত্তরে কোনও রাখঢাক না করেই গম্ভীর বলেন, ‘হ্যাঁ, সত্যি বলতে এমন হয়েছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি সামলানোর মতো ক্ষমতা আমার রয়েছে। যত দিন পারব, এই চাপ নিতে পারব। আমি সে ভাবেই তৈরি। চাপ নিতে পারি, প্রয়োজনে বুলেটও খেতে পারি। তবে আমিও একজন মানুষ। তাই কখনও কখনও মানসিক ভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তেই পারি। এখনও পর্যন্ত অবশ্য সেই পরিস্থিতি সামলাতে পেরেছি।’
২০২৬ সালে ভারতীয় দলকে একের পর এক সিরিজ খেলতে হয়েছে। বছরের মধ্যে ১২টি সিরিজ খেলেছে ভারত। একটি সিরিজ শেষ হওয়ার পর পরেরটির প্রস্তুতি শুরু করার জন্য খুব বেশি সময় পাওয়া যায়নি। ক্রিকেটারদের পাশাপাশি কোচ এবং সাপোর্ট স্টাফদের ওপরেও তার প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে তিন ধরনের ক্রিকেটে দলের দায়িত্বে থাকায় গম্ভীরকে প্রায় সব সময়ই ক্রিকেটের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে খেলেছিল ভারত। সেই সিরিজ শেষ হওয়ার পরেই নিউজিল্যান্ডে উড়ে যেতে হয় দলকে। সেখানে প্রথম ম্যাচের আগে মাত্র একটি অনুশীলন সেশন পেয়েছিলেন ক্রিকেটাররা। দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টার বিমানযাত্রার পর নতুন পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে খেলতে হয়েছিল তাঁদের। সেই পরিস্থিতিতে প্রথম তিনটি ম্যাচ জিতে সিরিজ নিজেদের পকেটে পুরেছিল ভারত। শেষ দু’টি ম্যাচ হারলেও ৩-২ ব্যবধানে সিরিজ জেতে শ্রেয়স আয়ারের দল।
দলের এই পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেছেন গম্ভীর। তাঁর মতে, এত কম প্রস্তুতির সময় পেয়েও যে ভাবে ক্রিকেটাররা নিজেদের মেলে ধরেছেন, তা প্রশংসার যোগ্য। তিনি বলেন, ‘প্রথমত, এটা অসাধারণ একটা প্রচেষ্টা। ছেলেরা প্রস্তুতির জন্য মাত্র এক দিন সময় পেয়েছিল। সম্পূর্ণ আলাদা পরিবেশ, আবহাওয়া এবং মাঠের মাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়েছিল। তার ওপর নিজেদের ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডের মতো শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে খেলতে হয়েছে। দলের অধিকাংশ ক্রিকেটারেরই এর আগে নিউজিল্যান্ড সফরের অভিজ্ঞতা ছিল না।’
এর পরেই ক্রিকেটারদের কৃতিত্বের কথা তুলে ধরেন তিনি। গম্ভীরের কথায়, ‘আমার মতে, ১৫ ঘণ্টার বিমানযাত্রার পর মাত্র একটি অনুশীলন সেশন করে যদি ক্রিকেটাররা এই ধরনের পারফরম্যান্স করতে পারে, তা হলে তাদের কৃতিত্ব দিতেই হবে। এই সাফল্যের কথা আমাদের সব সময় মনে রাখা উচিত।’
তবে শুধু দলের পারফরম্যান্স নয়, কোচ হিসেবে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও কথা বলেছেন গম্ভীর। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিটি দলে প্রচুর প্রতিভাবান ক্রিকেটার থাকেন। কিন্তু সবাইকে একসঙ্গে প্রথম একাদশে সুযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। কাউকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে সহজ নয়, তা স্বীকার করেছেন তিনি। তবে জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে দলের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াই তাঁর দায়িত্ব।
গম্ভীর বলেন, ‘আমার কাজ সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। সাজঘরে বসে সবাইকে খুশি করার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব সহজ। কিন্তু আমার কাজ হল সাজঘরের পরিবেশ নিরাপদ রাখা এবং দীর্ঘ দিন ধরে যারা ভাল খেলেছে, তাদের সমর্থন করা।’
ক্রিকেটারদের সঙ্গে এই ধরনের কথাবার্তা যে কোচের কাছে কঠিন, সেটাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, সততা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। গম্ভীর বলেন, ‘কোচ হিসেবে এই কথাবার্তাগুলো সব সময় কঠিন হয়। আমার কাছে সততা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরাসরি কথা বলা এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ থাকা জরুরি। এটাই প্রধান কোচের কাজ। যত দিন আমি এই বিষয়গুলো বজায় রাখতে পারব, তত দিন যে কোনও ক্রিকেটারের চোখের দিকে তাকিয়ে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব।’




