কলকাতা: বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমে ভুয়ো চিকিৎসকের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে এ বার নিয়োগের ক্ষেত্রেই কড়া নজরদারি শুরু করছে রাজ্য। রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলে চিকিৎসকের নাম এবং বৈধ রেজিস্ট্রেশন যাচাই না করে কোনও চিকিৎসককে নিয়োগ করা যাবে না। কারও শিক্ষাগত যোগ্যতা, পরিচয় কিংবা চিকিৎসা করার অনুমোদন নিয়ে সামান্য সন্দেহ তৈরি হলেও তা এড়িয়ে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে। এই মর্মে নতুন নির্দেশিকা জারি করেছে স্বাস্থ্য ভবন।
ভুয়ো চিকিৎসক সংক্রান্ত একটি মামলায় কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে জানতে চেয়েছিল, এমন চিকিৎসকদের চিহ্নিত করতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আদালতের সেই নির্দেশের পরেই নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য দফতর। রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির কাছ থেকে ২ অক্টোবরের মধ্যে এ বিষয়ে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ভবনের নির্দেশিকায় বিষয়টিকে ‘অত্যন্ত জরুরি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দেশিকায় মোট চার দফা পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, কোনও বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম বা চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে নতুন করে চিকিৎসক নিয়োগের আগে তাঁর রেজিস্ট্রেশন-সহ প্রয়োজনীয় নথি খতিয়ে দেখতে হবে। ২০১৭ সালের ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট (রেজিস্ট্রেশন, রেগুলেশন অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি) রুলস’-এর ৭(৪) নম্বর বিধি মেনে এই যাচাই করতে হবে। অর্থাৎ শুধু কোনও চিকিৎসকের দেওয়া শংসাপত্র বা পরিচয়পত্র দেখেই নিয়োগ নয়, সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা নিশ্চিত করার দায়িত্বও থাকবে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের।
দ্বিতীয়ত, বৈধ রেজিস্ট্রেশন বা প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও কেউ চিকিৎসক হিসাবে পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা পরিষেবা দিচ্ছেন কি না, সে দিকেও নজর রাখতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য ভবনের বক্তব্য, এমন প্রবণতার ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হন এবং চিকিৎসা পরিষেবা নিতে গিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই সমস্ত লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় নির্দেশে বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তির পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রেজিস্ট্রেশন অথবা চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার আইনগত অধিকার নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। প্রয়োজনে রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা এবং রেজিস্ট্রেশনের সত্যতা যাচাই করতে হবে।
চতুর্থত, অনুমোদন ছাড়াই ভুয়ো পরিচয়ে চিকিৎসা করছেন, এমন কাউকে চিহ্নিত করা গেলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপও করা হবে। স্বাস্থ্য ভবনের জারি করা এই নির্দেশিকায় রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা অধিকর্তা স্বপন সরেনের স্বাক্ষর রয়েছে। জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট সমস্ত কর্তৃপক্ষকে নির্দেশিকাটি যথাযথ ভাবে মেনে চলতে বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ভবনের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে রাজ্যের বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড নার্সিংহোম’। সংগঠনের সম্পাদক রাজীব পাণ্ডে জানিয়েছেন, ভুয়ো চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাঁরাও আগে তুলেছিলেন। তবে একই সঙ্গে মেডিক্যাল কাউন্সিলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
রাজীবের বক্তব্য, ‘‘ভুয়ো চিকিৎসক সংক্রান্ত সমস্যার বিরুদ্ধে আমরাই আওয়াজ তুলেছিলাম। রাজ্যের মেডিক্যাল কাউন্সিলের ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন দরকার। এত ভুয়ো ডাক্তার কী ভাবে তৈরি হল, তার জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের বিরুদ্ধেও পদক্ষেপ করতে হবে। আমরা সজাগ আছি। যাঁদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা নেই, তাঁদের নিয়োগ করা হবে না। কিন্তু সরকারকেও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ করতে হবে।’’
সরকারের নির্দেশকে স্বাগত জানালেও আরও সক্রিয় পদক্ষেপের দাবি তুলেছে পশ্চিমবঙ্গ ডক্টর্স ফোরাম। সংগঠনের সভাপতি কৌশিক চাকী জানিয়েছেন, শুধু বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোমের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে হবে না, চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন এবং যোগ্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থাতেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি আরজি কর হাসপাতালের আর্থিক দুর্নীতির মামলায় অন্যতম অভিযুক্ত প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ চিকিৎসক অভীক দে-র ট্রেনি রিজ়ার্ভ পোস্ট বাতিল করেছে রাজ্য সরকার। সেই নির্দেশে সরাসরি অভীক দে-র নাম উল্লেখ না করার বিষয়টিও তুলেছেন কৌশিক। তাঁর দাবি, ‘‘আমরা বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলিকে সজাগ রাখছি। কিন্তু মেডিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন অভীক দে। তাঁর সার্ভিস কোটার নথি জাল করার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে বলে আমরা মনে করি। খোদ কাউন্সিলের মধ্যে এমন ব্যক্তি থাকলে ব্যবস্থাটি কতটা স্বচ্ছ, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।’’
কৌশিকের আরও বক্তব্য, স্বাস্থ্য দফতরকে এই ধরনের ঘটনায় আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। তাঁর প্রশ্ন, সরকারি নির্দেশিকায় অভীক দে-র মতো বিতর্কিত নামগুলি উল্লেখ করার ক্ষেত্রে কেন অনীহা রয়েছে। তাঁর কথায়, সরকারের সদিচ্ছা শুধু নির্দেশিকা জারি করলেই প্রমাণিত হবে না, বাস্তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
হাইকোর্টের নির্দেশের পর স্বাস্থ্য ভবনের এই পদক্ষেপে বেসরকারি চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও কড়া হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকের ডিগ্রি, রেজিস্ট্রেশন এবং চিকিৎসা করার বৈধ অধিকার যাচাইয়ের দায়িত্ব এখন আরও স্পষ্ট ভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির উপর পড়ল। শেষ পর্যন্ত এই নজরদারি কতটা কার্যকর হয় এবং ভুয়ো চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে বাস্তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সে দিকেই নজর থাকবে।
