নয়াদিল্লি, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: চাঁদে পা রেখেছে ভারত, মঙ্গল থেকে মহাকাশের গভীরে পৌঁছেছে দেশের মহাকাশযান। ‘কম খরচে বড় সাফল্য’ ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিকে ঘিরে এই পরিচিতি বহু দিনের। কিন্তু নতুন এক গবেষণার রিপোর্ট সেই ধারণাতেই বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইতালির পলিটেকনিকো দি তোরিনোর গবেষকদের সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, প্রতি কিলোগ্রাম পেলোড মহাকাশে পাঠানোর খরচের নিরিখে বিশ্বের প্রধান মহাকাশশক্তিগুলির মধ্যে ভারতেই খরচ সবচেয়ে বেশি। এমনকি আমেরিকার তুলনায় ভারতের খরচ প্রায় চার গুণ।
কেমব্রিজের অর্থনীতিবিদ আলেসিও তেরজি এবং পলিটেকনিকো দি তোরিনোর ফ্রান্সেসকো নিকোলি-র গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Economics Letters জার্নালে। ১৯৬০ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৬,৭৪০টিরও বেশি রকেট উৎক্ষেপণের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা মহাকাশে পেলোড পৌঁছে দেওয়ার অর্থনীতি পর্যালোচনা করেছেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিম্ন-পৃথিবীর কক্ষপথে (LEO) এক কিলোগ্রাম পেলোড পাঠাতে ভারতের গড় খরচ ছিল প্রায় ১৩,৩০২ ডলার।
তালিকায় ভারতের পরেই রয়েছে ইউরোপ। সেখানে প্রতি কিলোগ্রামের খরচ প্রায় ৯,৮৯৭ ডলার। রাশিয়ার ক্ষেত্রে ৬,৬৮২ ডলার, চিনে ৫,৮০৯ ডলার এবং জাপানে ৫,২৮৭ ডলার। আর আমেরিকায় এই খরচ মাত্র ৩,২২৫ ডলার। বিশ্ব গড় ছিল ৩,৮৬৮ ডলার। অর্থাৎ আমেরিকার তুলনায় ভারতের প্রতি কিলোগ্রাম উৎক্ষেপণ খরচ প্রায় ৪.১ গুণ।
কিন্তু কেন? গবেষকদের ব্যাখ্যা, এর অন্যতম বড় কারণ রকেটের আকার এবং বহনক্ষমতা। ভারতের উৎক্ষেপণযানগুলি ঐতিহাসিক ভাবে তুলনামূলক কম পেলোড বহন করেছে। ফলে একটি রকেট উৎক্ষেপণের সঙ্গে যুক্ত বিপুল স্থায়ী খরচ কম সংখ্যক কিলোগ্রামের উপর ভাগ হয়ে যায়। তাতেই প্রতি কিলোগ্রামের হিসাব অনেক বেড়ে যায়। অর্থাৎ এই পরিসংখ্যান সরাসরি কোনও একটি রকেটের ‘টিকিটের দাম’ নয়; বরং নির্দিষ্ট ওজনের পেলোড কক্ষপথে পৌঁছে দিতে গড়ে কত অর্থ খরচ হচ্ছে, তার হিসাব।
আর এখানেই সামনে এসেছে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির আর একটি বড় সমস্যা উৎক্ষেপণের সংখ্যা। গবেষকদের মতে, নিয়মিত এবং বেশি সংখ্যায় রকেট উৎক্ষেপণ করলে প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বাড়ে, উৎপাদন ব্যবস্থা আরও দক্ষ হয় এবং পরিকাঠামোর স্থায়ী খরচ বেশি সংখ্যক মিশনের মধ্যে ভাগ করা যায়। আমেরিকার ক্ষেত্রে এই সুবিধা আরও স্পষ্ট হয়েছে স্পেসএক্সের দ্রুত উৎক্ষেপণ-পরিকাঠামো এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেটের কারণে।
বিশেষ করে Falcon 9-এর মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট মহাকাশে পৌঁছনোর অর্থনীতিই বদলে দিয়েছে। একই রকেটের প্রথম ধাপ বার বার ব্যবহার করা সম্ভব হওয়ায় উৎক্ষেপণ-প্রতি খরচ কমছে। বিপুল সংখ্যায় উৎক্ষেপণের ফলে সেই সুবিধা আরও বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, আমেরিকা ও ইউরোপে সময়ের সঙ্গে উৎক্ষেপণ খরচ কমার প্রবণতা পরিসংখ্যানগত ভাবে স্পষ্ট হলেও ভারত, চিন, রাশিয়া এবং জাপানের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়নি।
তবে এই রিপোর্ট প্রকাশের পরই প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে কি ভারতের ‘ফ্রুগাল ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর এত দিনের দাবি ভুল? বিষয়টি এত সরল নয়। গবেষণার ফলাফল নিয়ে ইতিমধ্যেই আপত্তি জানিয়েছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। ইসরোর চেয়ারম্যান ভি নারায়ণন গবেষণাটির তথ্যকে ‘ভুল’ বলে দাবি করেছেন। প্রাক্তন ইসরো চেয়ারম্যান এস সোমনাথও বলেছেন, শুধু ‘প্রতি কিলোগ্রাম খরচ’ দিয়ে একটি দেশের মহাকাশ কর্মসূচির সামগ্রিক দক্ষতা বিচার করা ঠিক নয়।
সোমনাথের বক্তব্যের মূল যুক্তি হল, বড় রকেট ও বিপুল পেলোড বহনের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোগ্রাম খরচ স্বাভাবিক ভাবেই কমে যায়। আমেরিকার বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ সংস্থাগুলি, বিশেষ করে স্পেসএক্স, বিপুল সংখ্যায় উৎক্ষেপণ করে। ফলে তাদের পরিকাঠামো ও প্রযুক্তির ব্যবহারও অনেক বেশি। ভারতের সঙ্গে সরাসরি সেই হিসাবের তুলনা করলে ছবিটা অসম্পূর্ণ হতে পারে।
আরও একটি সমস্যা রয়েছে। ভারতের সরকারি উৎক্ষেপণ খরচের সম্পূর্ণ কাঠামো সব সময় প্রকাশ্যে আসে না। একটি মিশনে বিজ্ঞানী-ইঞ্জিনিয়ারদের শ্রম, পরিকাঠামো, গবেষণা, পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তি উন্নয়নের খরচ কী ভাবে ভাগ করা হবে, তা নির্ধারণ করাও কঠিন। ফলে বিভিন্ন দেশের মধ্যে ‘প্রতি কিলোগ্রাম’ খরচের তুলনা করতে গেলে পদ্ধতিগত পার্থক্য থেকেই যেতে পারে।
তার পরেও গবেষণাটির তাৎপর্য কম নয়। কারণ ভারতের সামনে এখন মহাকাশ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা নেওয়ার লক্ষ্য। দেশীয় বেসরকারি সংস্থা, স্যাটেলাইট পরিষেবা, বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ এবং ভবিষ্যতের মানব মহাকাশ অভিযান সব ক্ষেত্রেই খরচ কমানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সেই জায়গায় ভারতের পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট। পুনর্ব্যবহারযোগ্য উৎক্ষেপণ প্রযুক্তি নিয়ে ভারত ইতিমধ্যেই পরীক্ষা চালিয়েছে। ভবিষ্যতের Next Generation Launch Vehicle-কে আরও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য করার পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি এখনও বাণিজ্যিক ভাবে নিয়মিত উৎক্ষেপণের পর্যায়ে পৌঁছয়নি।
অর্থাৎ কেমব্রিজের রিপোর্টের বার্তা একেবারে সরল নয় ‘ভারতের রকেট সবচেয়ে খারাপ’ এমন দাবি গবেষণাটি করছে না। বরং প্রশ্ন তুলছে, কম খরচে উৎক্ষেপণের যে পরিচিতি ভারতের রয়েছে, তা প্রতি কিলোগ্রাম পেলোডের হিসাবে এখনও কতটা সত্য? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ভবিষ্যতে আরও বেশি উৎক্ষেপণ, বড় পেলোড, বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তির দিকেই তাকাতে হবে ভারতকে।
মহাকাশে সাফল্যের পরবর্তী দৌড় তাই শুধু ‘কে কত দূর গেল’—তা নয়। প্রশ্ন এখন আরও কঠিন: কে কত কম খরচে, কত বেশি বার, কত বেশি ওজন নিয়ে মহাকাশে পৌঁছতে পারে? সেই প্রতিযোগিতায় আমেরিকা অনেকটা এগিয়ে। ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ ‘ফ্রুগাল স্পেস পাওয়ার’-এর পুরনো ভাবমূর্তিকে বাস্তব বাণিজ্যিক দক্ষতায় বদলে দেওয়া।