স্পোর্টস ডেস্ক: এশিয়ান গেমসে ভারতীয় টেনিসের গৌরবময় ইতিহাসে নেমে এল কালো ছায়া। একের পর এক সাফল্যের যে ধারাবাহিকতা চার দশক ধরে ভারতীয় টেনিসকে এশিয়ার মঞ্চে আলাদা পরিচয় দিয়েছিল, সদ্যসমাপ্ত এ বছরের আইচি-নাগোয়া এশিয়াডে সেটিই গিয়েছে থমকে। চার দশকের মধ্যে এই প্রথম কোনও টেনিস পদক ছাড়াই এশিয়াড শেষ করল ভারত। ১৯৮৬ সালের পর থেকে এমন ঘটনা ঘটেনি। ১৯৯০ সালের পর এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়ামঞ্চে প্রতিটি সংস্করণেই অন্তত একটি পদক জিতেছিল ভারতীয় টেনিস। নাগোয়ায় ভেঙে গেল সেই ধারাই। শেষ আশাটুকু বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সুমিত নাগাল। কিন্তু পুরুষদের সিঙ্গলসের কোয়ার্টার ফাইনালে চিনের উ ইবিংয়ের কাছে ৪-৬, ৪-৬ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতেই ভারতের পদক-স্বপ্নও শেষ হয়ে যায়। ফলটা শুধু একটি প্রতিযোগিতায় ব্যর্থতা নয়, ভারতীয় টেনিসের বর্তমান অবস্থারও যেন আয়না।
ভারতীয় টেনিসে এক সময় এশিয়াড মানেই ছিল পদকের নিশ্চয়তা। লিয়েন্ডার পেজ, মহেশ ভূপতি, সানিয়া মির্জা, সোমদেব দেববর্মনদের প্রজন্ম আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতকে বার বার সাফল্য এনে দিয়েছে। সিঙ্গলস থেকে ডাবলস, পুরুষ থেকে মহিলা—বিভিন্ন বিভাগেই ভারতীয় খেলোয়াড়েরা পদকের লড়াইয়ে থেকেছেন। সেই সোনালি প্রজন্মের অবসর এবং ধীরে ধীরে মঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছিল উত্তরসূরির প্রশ্ন। নাগোয়ার ফলাফল সেই প্রশ্নকেই আরও তীব্র করে তুলল। পুরনো তারকারা নেই, অথচ তাঁদের জায়গা নেওয়ার মতো নতুন মুখও এখনও ধারাবাহিক ভাবে উঠে আসতে পারেননি। ফলে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতীয় টেনিসের যে ‘সেফটি নেট’ এত দিন ছিল, সেটিই যেন উধাও হয়ে গিয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দল নির্বাচন ঘিরে বিতর্কও। এশিয়াডের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় কে সুযোগ পাবেন, কোন খেলোয়াড়কে কোন ইভেন্টে নামানো হবে—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কিন্তু বিতর্কের বাইরেও রয়েছে আরও বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক সার্কিটে নিয়মিত সাফল্য পাওয়া ভারতীয় খেলোয়াড়ের সংখ্যা কমেছে। তরুণদের মধ্যে প্রতিভার অভাব না থাকলেও সেই প্রতিভাকে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সাফল্যে পরিণত করার পথটি এখনও যথেষ্ট মসৃণ নয়। জুনিয়র স্তর থেকে সিনিয়র সার্কিটে ওঠার সময় যে ব্যবধান তৈরি হয়, তা পূরণ করতে না পারলে বড় মঞ্চে ধারাবাহিক সাফল্য পাওয়া কঠিন। নাগোয়ার ব্যর্থতা তাই শুধু কয়েকটি ম্যাচ হারার গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় টেনিসের পরিকাঠামো, প্রতিভা তুলে আনা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁদের ধরে রাখার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন।
তবু এই ব্যর্থতার মধ্যেই ভবিষ্যতের জন্য সতর্কবার্তা দেখছেন অনেকে। একটি এশিয়াডে পদক না পাওয়া হয়তো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ শেষ করে দেয় না, কিন্তু চার দশকের ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়া যে বড় সংকেত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ক্রিকেট, হকি, শ্যুটিং, অ্যাথলেটিক্স-সহ একাধিক খেলায় ভারত যখন এশিয়ার মঞ্চে নিজেদের শক্তি বাড়াচ্ছে, তখন টেনিসে এমন পশ্চাদপসরণ নিঃসন্দেহে চিন্তার। নাগালদের প্রজন্মের পর কে হাল ধরবেন, সেই উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তাই নাগোয়ার শূন্য হাত ভারতীয় টেনিসের কাছে শুধুই একটি পদকহীন এশিয়াড নয়। বরং আগামী দিনের জন্য নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ডাক। চার দশকের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে এখনই খুঁজতে হবে পরবর্তী প্রজন্মের পেজ, ভূপতি বা সানিয়াকে।
