নয়াদিল্লি, নীলাঞ্জন দাশগুপ্ত: আকাশে ওড়েন তাঁরা, কিন্তু সেই আকাশই কি দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের শরীরের জন্য বিপদ ডেকে আনছে? বিমানের পাইলট এবং কেবিন ক্রুদের নিয়ে নতুন এক গবেষণায় এমনই আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, রেডিয়েশন-সম্পর্কিত ক্যানসারে মৃত্যুর অনুপাত পাইলট এবং ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টদের মধ্যে অন্য ৫০০-রও বেশি পেশার তুলনায় সবচেয়ে বেশি।
তবে এই গবেষণা সরাসরি প্রমাণ করছে না যে বিমানে কাজ করার কারণেই তাঁদের ক্যানসার হচ্ছে। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের গবেষকেরা ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আমেরিকায় মৃত প্রায় ১ কোটি ২৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যুসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। মোট ৫০৩টি পেশাকে এই গবেষণার আওতায় রাখা হয়েছিল। কোন পেশায় রেডিয়েশন-সম্পর্কিত ক্যানসারে মৃত্যুর হার বেশি, সেটিই ছিল গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য। ফলাফলে দেখা যায়, তালিকার একেবারে উপরে ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টরা, দ্বিতীয় স্থানে পাইলটরা।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে JAMA Internal Medicine-এ। সংখ্যার হিসাবে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষকদের হিসাব, সাধারণ কর্মজীবী মানুষের তুলনায় ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টদের রেডিয়েশন-সম্পর্কিত ক্যানসারে মৃত্যুর সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি। পাইলটদের ক্ষেত্রে সেই অতিরিক্ত ঝুঁকি প্রায় ৩৬ শতাংশ। মোট মৃত্যুর মধ্যে এই ধরনের ক্যানসারের অংশ ছিল ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টদের ক্ষেত্রে প্রায় ৬.৯ শতাংশ এবং পাইলটদের ক্ষেত্রে ৬.৭ শতাংশ। সাধারণ কর্মজীবী মানুষের ক্ষেত্রে এই হার প্রায় ৫ শতাংশ।
কিন্তু বিমানে কাজ করার সঙ্গে রেডিয়েশনের সম্পর্ক কোথায়?
উত্তর লুকিয়ে রয়েছে পৃথিবীর অনেক উপরে। মহাকাশ থেকে প্রতিনিয়ত আসছে উচ্চশক্তির কণা—যাকে বলা হয় কসমিক রেডিয়েশন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল এই বিকিরণের বড় অংশ আটকে দেয়। কিন্তু বিমান যত উপরে ওঠে, বায়ুমণ্ডলের সেই সুরক্ষা তত কমে। ফলে মাটির তুলনায় বিমানের উচ্চতায় কসমিক রেডিয়েশনের সংস্পর্শ বেশি।
আর পাইলট বা কেবিন ক্রু? তাঁরা বছরে কয়েক ঘণ্টা নয়, দিনের পর দিন আকাশে থাকেন।
গবেষণা অনুযায়ী, নিয়মিত বিমানকর্মীরা বছরে আনুমানিক ৩ থেকে ৬ মিলিসিভার্ট কসমিক রেডিয়েশনের সংস্পর্শে আসতে পারেন। তুলনায়, বছরে ১০টি আন্তঃরাজ্য যাতায়াতের রিটার্ন ফ্লাইট করা একজন যাত্রীর ক্ষেত্রে এই পরিমাণ আনুমানিক ০.৪ মিলিসিভার্ট। তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। গবেষকেরা বলেননি যে বিমানের রেডিয়েশনই পাইলট বা কেবিন ক্রুদের ক্যানসারের একমাত্র কারণ।
ব্যক্তিভেদে তাঁরা কতটা রেডিয়েশনের সংস্পর্শে এসেছেন, সেই তথ্য গবেষকদের হাতে ছিল না। মৃত্যুসনদে পেশার তথ্য ভুল থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে। আরও কিছু কারণও থাকতে পারে। রাতের ডিউটি, একাধিক টাইম জ়োন পার হওয়া, দীর্ঘ সময়ের যাত্রা এবং অনিয়মিত ঘুমের কারণে শরীরের স্বাভাবিক সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবঘড়ি বার বার বিঘ্নিত হয়। সেটিও ক্যানসারের ঝুঁকিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিমানের জানলা দিয়ে অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শও সম্ভাব্য আর একটি কারণ হিসাবে আলোচনায় এসেছে। গবেষণায় আরও একটি বিষয় নজর কেড়েছে।
পাইলট এবং ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টদের মধ্যে সামগ্রিক ভাবে সমস্ত ধরনের ক্যানসারে অস্বাভাবিক বেশি মৃত্যুহার দেখা যায়নি। বরং রেডিয়েশন-সম্পর্কিত বলে বিবেচিত ক্যানসারগুলির ক্ষেত্রেই বাড়তি ঝুঁকির ইঙ্গিত মিলেছে। এর মধ্যে লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা, মাল্টিপল মায়েলোমা, ত্বক, স্তন, থাইরয়েড, প্রস্টেট এবং কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের কয়েক ধরনের ক্যানসার রয়েছে। অর্থাৎ, যে আকাশপথকে আমরা আধুনিক জীবনের দ্রুততম যাতায়াতের পথ বলে মনে করি, সেই আকাশেই দিনের পর দিন কাজ করা মানুষদের শরীরে জমছে একটি বিশেষ ধরনের বিকিরণ।
এক বার বিমানযাত্রায় যাত্রীর ঝুঁকি আর বছরের পর বছর পেশাগত ভাবে আকাশে থাকার ঝুঁকি এক নয়—গবেষণাটি মূলত সেই দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শের দিকেই নজর ঘুরিয়েছে। এ বার প্রশ্ন উঠছে, বিমানকর্মীদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি আরও শক্তিশালী করা দরকার? গবেষকদের মতে, বিষয়টি নিয়ে নীতি নির্ধারক, বিমান সংস্থা এবং চিকিৎসকদের আরও গুরুত্ব দিয়ে ভাবা প্রয়োজন। আমেরিকার ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিমানকর্মীদের আয়নাইজ়িং রেডিয়েশনের সংস্পর্শের কথা স্বীকার করলেও তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট ফেডারেল রেডিয়েশন ডোজ সীমা বা বাধ্যতামূলক নজরদারির ব্যবস্থা নেই।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষার পাশাপাশি উচ্চ-উচ্চতায় দীর্ঘ সময় কাজ করা বিমানকর্মীদের ক্যানসারের সম্ভাব্য লক্ষণগুলির দিকে বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নিয়মিত ত্বক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্ক্রিনিংয়ের কথাও বলা হয়েছে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। এই গবেষণা কোনও ব্যক্তির ক্যানসার হবে কি না, তা বলছে না; বরং দীর্ঘদিন আকাশে কাজ করা পাইলট ও কেবিন ক্রুদের পেশাগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। আকাশে ওড়ার স্বপ্নের সঙ্গে সেই আকাশের অদৃশ্য বিকিরণের সম্পর্ক কতটা গভীর, তার উত্তর পেতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।