নিউ অরলিয়ন্স: জন্মদিনের আনন্দ শেষ হতে না হতেই নেমে এল শোকের ছায়া। লেকে সাঁতার কাটতে গিয়ে বিরল এবং ভয়ঙ্কর এক মস্তিষ্কের সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হল আমেরিকার লুইজিয়ানা প্রদেশের আট বছরের এক শিশুকন্যার। নাম লিলিয়ান স্মার্ট। চিকিৎসকদের মতে, Naegleria fowleri নামে এক অতি ক্ষুদ্র অ্যামিবার সংক্রমণেই আক্রান্ত হয়েছিল সে। এই জীবাণুকে সাধারণ ভাবে ‘ব্রেন-ইটিং অ্যামিবা’ বলা হয়।
লিলিয়ান রস্টনের বাসিন্দা। পরিবারের সঙ্গে লুইজ়িয়ানার ক্লাইবর্ন পারিশের কাছে লেক ক্লাইবর্নে সাঁতার কাটার পরই অসুস্থ হয়ে পড়ে সে বলে জানা গিয়েছে। ১৯ অগস্ট লুইজ়িয়ানা স্বাস্থ্য দফতর জানায়, রাজ্যের এক বাসিন্দার শরীরে Naegleria fowleri সংক্রমণ ধরা পড়েছে এবং লেক ক্লাইবর্নে সাঁতার কাটার সময়ই সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। পরে স্থানীয় সূত্রে আক্রান্ত শিশুটির পরিচয় লিলিয়ান হিসাবে সামনে আসে।
অসুস্থ হয়ে ১৫ অগস্ট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল লিলিয়ান। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। মস্তিষ্কে ভয়াবহ ফোলাভাব তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ২২ অগস্ট, নিজের অষ্টম জন্মদিনের ঠিক পরের দিনই মৃত্যু হয় তার।
সন্তানকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছে পরিবার। লিলিয়ানের পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, তার মস্তিষ্কের ক্ষতি এতটাই গুরুতর হয়ে গিয়েছিল যে চিকিৎসার সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরিবারের শোকবার্তা ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে সমাজমাধ্যমে।
কী এই ‘ব্রেন-ইটিং অ্যামিবা’?
Naegleria fowleri একটি অতি ক্ষুদ্র জীব। সাধারণত উষ্ণ মিষ্টি জলে—যেমন হ্রদ, নদী বা পুকুরে—এটি থাকতে পারে। শরীরে ঢোকার প্রধান রাস্তা নাক। দূষিত জল নাক দিয়ে ঢুকে গেলে অ্যামিবাটি নাসারন্ধ্রের পথ ধরে মস্তিষ্কে পৌঁছতে পারে। সেখান থেকেই শুরু হয় Primary Amebic Meningoencephalitis (PAM) নামে অত্যন্ত বিরল মস্তিষ্কের সংক্রমণ।
তবে আতঙ্কের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও রয়েছে। দূষিত জল গিলে ফেললেই এই সংক্রমণ হয় না। সাধারণত নাকের ভিতর দিয়ে জল ঢোকার মাধ্যমেই সংক্রমণ ঘটে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য মানুষের শরীরেও এই রোগ ছড়ায় না। ঠিকমতো ক্লোরিন দেওয়া সুইমিং পুল এবং সমুদ্রের নোনা জলে এই অ্যামিবা সাধারণত পাওয়া যায় না।
শুরুতে সাধারণ জ্বর-সর্দির মতো, পরে ভয়ঙ্কর
এই সংক্রমণের প্রথম দিকের লক্ষণ অনেক সময় খুব সাধারণ বলেই মনে হতে পারে। তীব্র মাথাব্যথা, জ্বর, বমি বমি ভাব এবং বমি হতে পারে। কিন্তু দ্রুত পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে যেতে পারে। ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি এবং অচেতন হয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণত সংক্রমণের কয়েক দিনের মধ্যেই লক্ষণ শুরু হয় এবং রোগ দ্রুত এগোয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, রোগটি অত্যন্ত বিরল হলেও আক্রান্ত হলে মৃত্যুর আশঙ্কা ভয়াবহ রকম বেশি। মার্কিন সিডিসি-র হিসাব অনুযায়ী, ১৯৩৭ সাল থেকে আমেরিকায় প্রায় ১৮০টি সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সিডিসি-র তথ্য অনুযায়ী, PAM-এ আক্রান্তদের প্রায় ৯৭ শতাংশের মৃত্যু হয়।
লুইজিয়ানাতেও এই সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল। স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে রাজ্যে হাতে গোনা কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। ফলে লিলিয়ানের মৃত্যু নতুন করে উষ্ণ মিষ্টি জলে সাঁতার কাটার সময় সতর্কতার প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।
বিরল বলেই কি ভয় নেই?
চিকিৎসকদের মতে, এই সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল। তাই লেক বা নদীতে সাঁতার কাটলেই এমন সংক্রমণ হবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। তবে উষ্ণ মিষ্টি জলে সাঁতার কাটার সময় জল যাতে জোর করে নাকের ভিতরে না ঢোকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষ করে গরমকালে উষ্ণ মিষ্টি জলের উৎসে সতর্কতা বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
একটি ছোট্ট সাঁতার। তার পর অসুস্থতা। আর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে মস্তিষ্কে ভয়াবহ সংক্রমণ। আট বছরের লিলিয়ানের মৃত্যু তাই শুধু একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়, উষ্ণ মিষ্টি জলে সাঁতার কাটার সময় অতি বিরল হলেও যে বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে, সেই সতর্কবার্তাও বটে।
জন্মদিনে যে শিশুর হাসিতে বাড়ি ভরেছিল, তার পরের দিনই নিস্তব্ধ হয়ে গেল সেই বাড়ি!