হাবিবুর রহমান, ঢাকা: ঢাকা-কলকাতা রেল যোগাযোগে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে যাচ্ছে পদ্মা সেতু। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে চালানোর প্রস্তাব নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা হয়েছে দুই দেশের রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে। নতুন রুটে ট্রেনটি চালু করা সম্ভব হলে বর্তমান রুটের তুলনায় যাত্রীদের তিন ঘণ্টা সময় সাশ্রয় হতে পারে। তবে রুট পরিবর্তন ও ট্রেন চালুর বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ভারতীয় পক্ষকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিতে হবে এবং এরপর বাংলাদেশকে কারিগরি ও পরিচালনাগত বিষয়গুলো পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নিবে।
সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৩৮তম বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসরকার রেলওয়ে মিটিংয়ে (আইজিআরএম) মৈত্রী এক্সপ্রেসের সম্ভাব্য নতুন রুট নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ভারতীয় পক্ষ পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেনটি পরিচালনার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রকের অতিরিক্ত সচিব মো. জিয়াউল হক জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক প্রস্তাব পাওয়া গেলে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হবে। মৈত্রী এক্সপ্রেস বর্তমানে ঢাকা থেকে কলকাতার মধ্যে ঐতিহাসিক রেল যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো ১৮ জুলাই ২০২৪ থেকে চলাচল বন্ধ রয়েছে। মৈত্রী এক্সপ্রেসও এর মধ্যে রয়েছে। নতুন রুটে পদ্মা সেতু ব্যবহার করা হলে ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সরাসরি রেল যোগাযোগ কাজে লাগানো যাবে। রেলপথ মন্ত্রকের আধিকারীকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এতে মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রাপথের দূরত্ব কমবে এবং যাত্রীরা আনুমানিক তিন ঘণ্টা সময় বাঁচাতে পারবেন। সাশ্রয় হবে ভাড়াও। নতুন রুটে দূরত্ব ও পরিচালনব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পক্ষ।
ফলে যাত্রীরা সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত কত টাকা সাশ্রয় করবেন, নাকি ভাড়ার কাঠামো পরিবর্তনের কারণে ব্যয়ের হিসাব ভিন্ন হবে- তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পদ্মা সেতুর নিচের অংশ দিয়ে রেল চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু ঢাকা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে সড়ক ও রেল যোগাযোগের নতুন পথ তৈরি করেছে। সেতুর উপর দিয়ে যানবাহন এবং নিচের অংশ দিয়ে রেল চলাচল করে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা থেকে মাওয়া, মাওয়া থেকে ভাঙ্গা এবং ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপনের কাজ করা হয়েছে।
এই অবকাঠামো ব্যবহার করে ভবিষ্যতে আন্তঃদেশীয় ট্রেনের রুট পুনর্বিন্যাসের সুযোগ তৈরি হয়েছে। মৈত্রী এক্সপ্রেসকে এই রুটে নেওয়া হলে এটি শুধু একটি ট্রেনের পথ পরিবর্তন নয়; বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে। কারণ, পদ্মা সেতু হয়ে আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর আগে এ পথে আন্তর্জাতিক ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা, ইমিগ্রেশন, নিরাপত্তা, স্টেশন ব্যবস্থাপনা এবং ট্রেন ঘোরানোর মতো বিষয় পরীক্ষা করতে হবে। মৈত্রী এক্সপ্রেস পদ্মা সেতু হয়ে চললে সময় কমার বিষয়টি আধিকারীকরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করলেও খরচ কমার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়, বরং নতুন রুটের দূরত্ব ও পরিচালন ব্যয়ের পরিবর্তনের কারণে ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
তাই ‘সময় ও খরচ দুটোই কমবে’-এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে নতুন ভাড়া ও পরিচালনব্যয়ের হিসাব চূড়ান্ত হওয়া প্রয়োজন। এদিকে মৈত্রী এক্সপ্রেস পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিষয়ও দুই দেশের আলোচনায় রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে ভারতীয় রেলের সঙ্গে আর্থিক হিসাব-নিকাশ ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ফলে নতুন রুট চালুর ক্ষেত্রে যাত্রীভাড়া, পরিচালন ব্যয় এবং দুই দেশের রেলওয়ের আর্থিক সমন্বয়- সবগুলো বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মৈত্রী এক্সপ্রেস কবে থেকে পদ্মা সেতু হয়ে চলবে- এ বিষয়ে এখনও কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতীয় পক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়ার পর বিষয়টি পরীক্ষা করা হবে। এরপর সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-কলকাতা রেলযাত্রায় সময়ের উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হতে পারে। একই সঙ্গে পদ্মা সেতু ও এর রেল সংযোগ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে। এখন দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ও কারিগরি মূল্যায়নের ওপরই নির্ভর করছে- মৈত্রী এক্সপ্রেস শেষ পর্যন্ত নতুন এই রুটে কবে যাত্রা শুরু করবে।
