গোয়া, অঙ্কন দাস: বিজেপিকে নিশানা করে তীক্ষ্ণ শব্দ-বাণ ছুঁড়লেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ গোয়ায় আয়োজিত এক জনসভায়। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করেছেন খাড়্গে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে ব্যঙ্গের খড়গাঘাত করেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিজেপি ও আরএসএস-এর অবদান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং সরকার গঠনের লক্ষ্যে রাজ্যের শাসক দলের বিরুদ্ধে বিধায়কদের 'অপহরণ' করার অভিযোগ আনেন। খাড়গে বিজেপি ও আরএসএস-র সমালোচনা করে স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তাদের 'ভারত-বিরোধী' ও 'ধর্ম-বিরোধী' বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, 'বিজেপি বারবার গান্ধী পরিবার ও সোনিয়া গান্ধীর প্রসঙ্গ তোলে।' তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, 'আমি যখন বিধায়ক হয়েছিলাম, তখন অমিত শাহের জন্মই হয়নি। তাঁর বয়স কত? ৫৭ না ৫৮? এঁদের বয়স ৫৬ বা ৫৭ বছর। দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন আমাদের দলের মানুষ। আপনারা লড়াই করেছিলেন? বলুন তো, বিজেপির কোন ব্যক্তি দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন? আরএসএস-এর কোন ব্যক্তি দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন? আর আমরা দেশপ্রেমিক নই? এঁরাই দেশের বিরুদ্ধে। ভারত-বিরোধী। আপনারা ভারত-বিরোধী।'
কংগ্রেস বিজেপিকে ধর্ম-বিরোধী বলেও অভিযুক্ত করেছেন। এআইসিসি (AICC) সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেন যে, উত্তরাখণ্ডের হালদওয়ানিতে তাঁর জনসভার পর একটি স্থানে 'শুদ্ধিকরণ' (ধর্মীয় শুদ্ধি প্রক্রিয়া) অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে খাড়গে বলেন, 'আপনারা ধর্ম-বিরোধী। আপনারা ধর্ম-বিরোধী কারণ আমার মতো একজন মানুষ যখন উত্তরাখণ্ডে গিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে ভাষণ দেন, তখন তার দুদিন পরেই আপনারা শুদ্ধিকরণ করেন। এই দেশে কি এমনটাই চলে? আপনাদের ধর্ম কোথায়? আপনাদের ধর্ম কি এটাই শেখায়? আপনাদের লোকজন কি এটাই শেখায়? আপনাদের গুরুরা কি এমনটাই শিক্ষা দেন? কোথায় আপনাদের গোলওয়ালকর গুরুজি? কোথায় আপনাদের সেই সব শিক্ষক যাঁরা আপনাদের শিখিয়েছেন? তাঁরা কি কেবল এটাই শিখিয়েছেন? শুদ্ধিকরণ করো।'
স্বাধীনতা আন্দোলনে কংগ্রেস নেতাদের অবদানের কথা তুলে ধরে খাড়গে বলেন,' মহাত্মা গান্ধী তাঁর সমগ্র জীবন স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন এবং জওহরলাল নেহরু ১৪ বছর কারাগারে কাটিয়েছিলেন।' তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, অন্য 'কোনো দলের পক্ষে সেই ঐতিহ্যের সমকক্ষ হওয়া সম্ভব নয়' ধর্মীয় রাজনীতির কথা তুলে খাড়গে আরও অভিযোগ করেন, ' বিজেপি ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজনকে উসকে দিয়ে দেশের ক্ষতি করছে'। তিনি স্বাধীনতার অন্যকে কংগ্রেসের ভূমিকা সম্পর্কে বলেন 'এই দেশের জন্য মহাত্মা গান্ধীজি ও পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুজি যে অবদান রেখেছেন, তেমন অবদান আর কারও নেই। নেহরুজি ১৪ বছর কারাগারে ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীজি নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন।
আমরা কি দেশপ্রেমিক নই? আপনারা নিজেরা দেশপ্রেমিক নন। দেশপ্রেমিক হলে আপনারা ঐক্যের কথা বলতেন। দেশপ্রেমিক হলে আপনারা সবাই মিলে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলতেন। দেশপ্রেমিক হলে আপনারা ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলতেন। কিন্তু আপনারা? আপনারাই সেই লোক যারা দেশকে ধ্বংস করে। আপনারাই দেশকে ধ্বংস করেন। আপনারাই সেই লোক যারা লড়াই-ঝগড়া বাধায়। যত খুশি লড়াই করুন। আগুন লাগান। পেট্রোল ঢালুন। নকল পেট্রোল। সব কিছুতে আগুন ধরিয়ে দিন। এটাই তো তাদের কাজ।' এই কথার মধ্য দিয়ে খাড়গে বিজেপির উস্কানিমূলক রাজনীতি তথা অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টির কথা তুলে ধরেন।
খাড়গে আরও জানান তিনি দীর্ঘ ৫৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে নয়বার বিধায়ক, চারবার সাংসদ এবং দুবার রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। খাড়গে তাঁর এই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার কৃতিত্ব কংগ্রেস দলকেই দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন 'আমি চারবার সাংসদ হয়েছি। দুবার রাজ্যসভার সদস্য হয়েছি। আর এসবই আমি পেয়েছি কংগ্রেসের কল্যাণে। আমি কখনও হাল ছাড়িনি। অনেক সমস্যার মোকাবিলা করেছি। ছোটবেলায় আমার মা মারা যান। আমার ভাই মারা যান। বোনও মারা যায়। ওরা আমার বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়েছিল। আমিই কেবল বেঁচে ছিলাম। আমি এখনও টিকে আছি।'
আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে তিনি ভোটারদের আহ্বান জানান, যেন তারা এমন নেতাদের প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, 'যারা আপনাদের নিয়ে উপহাস করে এবং আপনাদের লুট করে তাদের দূরে সরিয়ে দিন। যারা আপনাদের নিয়ে মজা করে বা আপনাদের ঠকায়, তারা যখন আসবে তখন তাদের বলবেন, এখানে চাকরি দেওয়ার মতো কেউ নেই। আপনারা তো শুধু মজা করতেই আসেন। আমাদের এখানে তাদের কোনো জায়গা নেই। আমাদের কাছে জায়গা আছে কেবল সেইসব পর্যটকদের জন্য যারা গোয়ার সংস্কৃতিকে রক্ষা করেন। তাদেরই এখানে স্থান আছে। এটি আসলে চোরদের সরকার। কারণ আপনারা যে বিধায়ককে জিতিয়েছিলেন, তাকেই আপনারা সমর্থন করেছিলেন। অথচ সরকার কাদের হওয়ার কথা ছিল? কংগ্রেসের। কিন্তু তারা সব নষ্ট করে নিজেদের সরকার গড়েছে।'
ঐক্যের ডাক দিয়ে খাড়গে দলীয় কর্মীদের বুথওয়ারি কাজ করার এবং একটি জোরালো বার্তা দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, 'তাই আমি আপনাদের অনুরোধ করছি; একজোট হোন এবং বুথ-ভিত্তিক কাজ করুন। তাদের দেখিয়ে দিন যে আমরা ভীতু নই। আপনারা আমাদের বিধায়কদের চুরি করেছেন? আমরা তার দ্বিগুণ বিধায়ক ফিরিয়ে আনব। তাদের একথা জানিয়ে দিন। একজোট হোন। ঐক্য থাকলে সবকিছুই সম্ভব। ঐক্য না থাকলে এরা সবকিছু ধ্বংস করতেই থাকবে। ঐক্যের মধ্যেই সব নিহিত। বৈচিত্র্য থাকতে পারে, কিন্তু ঐক্য একান্ত প্রয়োজন।'
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বর্তমানে গোয়াতে বিধানসভার ৪০টি আসনের মধ্যে কংগ্রেসের দখলে রয়েছে তিনটি আসন এবং ইউরি আলেমাও বিরোধী দলনেতার দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দলটি ১১টি আসন জিতেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তাদের আটজন বিধায়ক বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন।