কাঠমান্ডু: একের পর এক দেহ উদ্ধার হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপ সরাতে গিয়ে সামনে আসছে নতুন নতুন মৃত্যুর ছবি। আর তার সঙ্গেই লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ হড়পা বানের ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ৪৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে শুক্রবার জানিয়েছে নেপাল পুলিশ। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ। নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন বিপুল সংখ্যক বিদেশি নাগরিক, তাঁদের মধ্যে ভারতীয়ের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। উদ্ধারকারীরা যখন নিখোঁজদের খোঁজে পাহাড়ি উপত্যকা চষে ফেলছেন, তখনই সামনে এসেছে আরও ভয়ঙ্কর আশঙ্কা—জল আর ধ্বংসাবশেষে তৈরি নতুন হ্রদ ভেঙে ফের হড়পা বান নামতে পারে।
২৬ অগস্ট সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে আচমকাই বিপর্যয় নেমে আসে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর জল ফুলেফেঁপে উঠে পরিণত হয় ভয়ঙ্কর স্রোতে। তার সঙ্গে মিশে যায় বরফ, পাথর, কাদা এবং পাহাড়ের বিপুল ধ্বংসাবশেষ। সেই স্রোত নীচের দিকে ধেয়ে গিয়ে রাস্তা, সেতু, বাড়ি, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যোগাযোগের পরিকাঠামো কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দেয়। বহু মানুষকে কোনও সুযোগ না দিয়েই ভাসিয়ে নিয়ে যায় জলরাশি।
প্রথমে মনে করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের জেরেই হয়তো এই বিপর্যয়। কিন্তু পরে উপগ্রহচিত্র এবং ভূকম্পন সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জানান, মূল কারণ ছিল হিমবাহের একটি বড় অংশ ভেঙে পড়া এবং তার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর-বরফ-ধ্বংসাবশেষ নীচে নেমে আসা। সেই ধাক্কায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ভয়াবহ ভাবে বদলে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর জলস্তর কয়েক মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
ভারতীয়দের নিয়ে বাড়ছে উৎকণ্ঠা
এই বিপর্যয়ের পর থেকেই ভারতীয় পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের খোঁজে নেপাল প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ভারত। প্রাথমিক তালিকায় শতাধিক ভারতীয় নিখোঁজ থাকার কথা জানা গিয়েছিল। পরে তালিকা বদলেছে, এবং বৃহস্পতিবারের হিসাবে নেপালে নিখোঁজদের মধ্যে ২৮৮ জন ভারতীয় থাকার কথা জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তবে বিভিন্ন সময়ে তালিকায় পরিবর্তন হয়েছে। ফলে নিখোঁজ ভারতীয়দের চূড়ান্ত সংখ্যা এখনও নিশ্চিত নয়।
নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার তীর্থযাত্রী এবং পর্যটকেরাও। সীমান্তবর্তী এই এলাকা দিয়ে বহু ভারতীয় তীর্থযাত্রী তিব্বতের দিকে যাতায়াত করেন। ফলে বিপর্যয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উদ্বেগ ছড়িয়েছে। পরিবারের সদস্যেরা অপেক্ষা করছেন প্রিয়জনের খবরের জন্য।
উদ্ধারে সবচেয়ে বড় বাধা রাস্তা-সেতু উধাও
বিপর্যয়ের তীব্রতা এতটাই বেশি যে বহু জায়গায় পৌঁছনোর রাস্তাই নেই। একের পর এক সেতু ভেঙে পড়েছে। পাহাড়ি রাস্তার বড় অংশ কাদা ও পাথরের নীচে চাপা পড়েছে। কোথাও নদীর গতিপথ বদলে গিয়েছে, কোথাও আবার গোটা জনপদ ঢেকে গিয়েছে ধ্বংসাবশেষে। ফলে স্থলপথে উদ্ধারকারী দল পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই পরিস্থিতিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে দুর্গম এলাকায় পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে। কোথাও উদ্ধার করা হচ্ছে আটকে পড়া মানুষকে, কোথাও আকাশপথে খাবার, জল ও জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আবহাওয়া এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধারকাজে বার বার বাধা আসছে।
বিপদ কি এখানেই শেষ?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন সেটাই। কারণ ভয়াবহ বানের পর নদীর একাধিক জায়গায় ধ্বংসাবশেষ জমে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো বাধা তৈরি হয়েছে। তার পিছনে জল জমে নতুন হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। জল বাড়তে থাকলে সেই বাধা আচমকা ভেঙে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বিপুল জলরাশি ফের নীচের দিকে ধেয়ে এসে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা তৈরি করতে পারে।
নেপালের দুর্যোগ মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যেই এমন একটি জলাধার নিয়ে সতর্ক করেছে, যেখানে ভোতে কোশি নদীর প্রবাহ ধ্বংসাবশেষে আটকে জল জমছে। অন্য দিকে, সীমান্তের ওপারে চিনের তিব্বতেও জল জমে থাকা একটি হ্রদ নিয়ে সতর্কতা জারি হয়েছে। আগামী কয়েক দিনে সেখানে বিপুল পরিমাণ জল ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে প্রথম বন্যার ক্ষত শুকানোর আগেই দ্বিতীয় বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হিমালয়ের বদলে যাওয়া চরিত্র
এই বিপর্যয় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে হিমালয়ের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিয়েও। বিজ্ঞানীদের মতে, উষ্ণতা বৃদ্ধি হিমবাহ ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। হিমবাহ গলন, বরফের দুর্বল হয়ে পড়া, পাথরের স্তর ভেঙে পড়া এবং হিমবাহ-নির্ভর হ্রদের জল বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদের কারণ হতে পারে। তবে এই নির্দিষ্ট বিপর্যয়ের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কতটা, তা নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে।
এই মুহূর্তে অবশ্য বিজ্ঞানীর তত্ত্বের চেয়েও জরুরি নিখোঁজদের সন্ধান। ৪৬৯ জনের মৃত্যু ইতিমধ্যেই নিশ্চিত। কিন্তু পাহাড়ি উপত্যকার বহু জায়গায় এখনও উদ্ধারকারী দল পৌঁছতে পারেনি। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা। আর তার উপর নতুন হ্রদের জলস্তর—যেন ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে পরবর্তী বিপদের সংকেত।
নেপালের আকাশে তাই এখন শুধু হেলিকপ্টারের শব্দ নয়, উদ্ধার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলির উৎকণ্ঠাও আরও ভারী হয়ে উঠছে।