কাঠমান্ডু: কয়েক সেকেন্ড। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান। তার মধ্যেই বদলে গেল গোটা দৃশ্যপট। নদীর ধারে তখনও দাঁড়িয়ে বাড়িঘর। রাস্তা দিয়ে চলছিল গাড়ি। নদীর উপর ছিল সেতু। তার পরেই পাহাড়ের বুক চিরে নেমে এল কালো, কাদামেশানো জলের স্রোত। প্রথমে দূর থেকে ছোট একটি ঢেউয়ের মতো। তার পর ক্রমশ ফুলে উঠল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তা পরিণত হল এক ভয়ঙ্কর জলপ্রাচীরে। আর তার ধাক্কায় চোখের সামনে ভেসে গেল একের পর এক বাড়ি, রাস্তা, সেতু।
নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সেই মুহূর্তই এ বার ক্যামেরাবন্দি হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োগুলিতে দেখা যাচ্ছে, কী ভাবে পাহাড়ি নদীর জল আচমকাই ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে নদীর দু’পাড়ের জনবসতির দিকে ধেয়ে আসছে। মানুষজন কিছু বুঝে ওঠার আগেই জল ঢুকে পড়ছে বাড়ির মধ্যে। কোথাও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সেতু ভেঙে পড়ছে, কোথাও নদীর স্রোতে গোটা বাড়িই কার্যত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
দৃশ্যটি যেন কোনও দুর্যোগের সিনেমার চিত্রনাট্য। কিন্তু এটি বাস্তব। নেপালের তিব্বত সীমান্ত সংলগ্ন পার্বত্য এলাকায় এই বিপর্যয়ের অভিঘাত সবচেয়ে ভয়াবহ। ভোতে কোশি এবং ত্রিশূলী নদী-সহ একাধিক পাহাড়ি নদীতে আচমকা জলস্তর বেড়ে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়েছে। নদীর জল শুধু বাড়েনি, তার সঙ্গে নেমে এসেছে কাদা, পাথর, গাছের গুঁড়ি এবং পাহাড়ের ধ্বংসাবশেষ। ফলে নদীর স্রোতের শক্তি কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
একটি ভিডিয়োয় সেই মুহূর্তটি বিশেষ ভাবে ভয় ধরাচ্ছে। ক্যামেরার সামনে প্রথমে স্বাভাবিক নদী। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দূরে দেখা যায় ঘন কাদামেশানো জল এগিয়ে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর চেহারা বদলে যায়। স্রোত ধাক্কা মারতে শুরু করে নদীর ধারের পরিকাঠামোয়। সেতুটি কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত প্রবল জলের ধাক্কায় ভেঙে পড়ে। তার পর আর কোনও বাধা নেই। জল ছুটে যায় জনবসতির দিকে।
বাড়ির ছাদ, দেওয়াল, গাছপালা— যা সামনে পড়েছে, তা-ই টেনে নিয়ে গিয়েছে স্রোত। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, এই ধরনের পাহাড়ি বন্যায় সতর্ক হওয়ার সময় প্রায় থাকে না। সমতলের বন্যার মতো ধীরে ধীরে জল বাড়ে না। পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ, বরফ, পাথর বা ভূমিধসের কারণে নদীতে আচমকা বিপুল জল ও ধ্বংসাবশেষ ঢুকে পড়লে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ক্ষেত্রেও তেমনই একটি পরিস্থিতির কথা সামনে এসেছে।
প্রাথমিক ভাবে ভূমিকম্পের সম্ভাবনার কথা মনে করা হলেও পরবর্তী পর্যবেক্ষণে হিমবাহ ধস এবং তার জেরে নদীতে বিপুল জল ও ধ্বংসাবশেষ ঢুকে পড়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ, পাহাড়ের অনেক উপরে শুরু হওয়া একটি ঘটনা কয়েক কিলোমিটার দূরের নদীতীরবর্তী জনপদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে মৃত্যুর স্রোত। ত্রিশূলী নদীর জলস্তর অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। নদীর জল যখন বাড়ছিল, তখন তা শুধু জল ছিল না— তার সঙ্গে বয়ে আসছিল পাহাড়ের পাথর, মাটি ও গাছপালা। ফলে নদী কার্যত একটি চলন্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তারই ফল দেখা গিয়েছে ভিডিয়োগুলিতে।
কোথাও সেতু নেই। কোথাও রাস্তা নেই। নদীর ধারে যে বাড়িগুলি ছিল, সেগুলির অনেকগুলির চিহ্নও খুঁজে পাওয়া কঠিন। বহু জায়গায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। রাস্তা ও সেতু ভেঙে যাওয়ায় দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধারকারী দলগুলির পৌঁছনো কঠিন হয়ে উঠেছে। কাদায় আটকে থাকা রাস্তা, নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা এবং প্রতিকূল আবহাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আর ধ্বংসস্তূপের নীচে বা স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষজনের খোঁজে চলছে তল্লাশি।
নেপালের এই বিপর্যয়ের অভিঘাত সীমান্ত পেরিয়েও পৌঁছেছে। ভারতীয় নাগরিক-সহ একাধিক বিদেশি নাগরিকের নিখোঁজ হওয়ার খবর সামনে এসেছে। কৈলাস-মানসসরোবর যাত্রাপথের সঙ্গে যুক্ত মানুষজনও বিপদের মধ্যে পড়েছেন বলে খবর। ফলে উদ্ধারকাজে শুধু স্থানীয় প্রশাসন নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও উদ্বেগ বেড়েছে। তবে ভয়াবহতার সবচেয়ে নির্মম সাক্ষী হয়ে রয়েছে সেই ভিডিয়োগুলি। কারণ সেখানে কোনও পরিসংখ্যান নেই, নেই সরকারি বিবৃতির ভাষা। আছে শুধু কয়েক সেকেন্ডের বাস্তব ছবি— একটি জনপদ কী ভাবে চোখের সামনে মুছে যেতে পারে।
একটি বাড়ি জলের ধাক্কায় কেঁপে উঠছে। তার পাশের আর একটি বাড়ির দেওয়াল ভেঙে পড়ছে। সেতুর কাঠামো দুলছে। তার পর আচমকাই সব কিছু জলের স্রোতে মিলিয়ে যাচ্ছে। ক্যামেরা চলছে। মানুষ তাকিয়ে দেখছে। কিন্তু প্রকৃতির সেই তাণ্ডব থামানোর ক্ষমতা কারও নেই। নেপালের পাহাড়ে এই মুহূর্তে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নয়। প্রশ্ন, আরও কোনও পাহাড়ি নদী কি একই ভাবে আচমকা ফুলে উঠতে পারে?
নতুন করে ধস বা হিমবাহ-জনিত বিপর্যয়ের আশঙ্কা কতটা? আর নদীর ধারে বসবাসকারী মানুষকে আগাম সতর্ক করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কারণ নেপালের এই ভিডিয়ো একটি ভয়াবহ সত্য আরও এক বার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে— পাহাড়ি নদীর স্রোত যখন ঘুরে দাঁড়ায়, তখন কয়েক মিনিট তো দূরের কথা, কয়েক সেকেন্ডও জীবন আর মৃত্যুর ব্যবধান হয়ে উঠতে পারে।