কাঠমান্ডু, নিউজ ডেস্ক: সকালটা আর পাঁচটা দিনের মতোই ছিল। বাজারে দোকান খুলেছিল, রাস্তায় চলছিল গাড়ি, মানুষ ব্যস্ত ছিল নিজেদের কাজে। আকাশেও এমন কোনও লক্ষণ ছিল না, যা দেখে ভয় পাওয়ার কারণ আছে। বৃষ্টিও হয়নি। তার মধ্যেই হঠাৎ পাহাড়ের দিক থেকে ধেয়ে এল জল, কাদা, পাথরের বিশাল স্রোত। কয়েক মিনিটের মধ্যে নদী ছাপিয়ে জল ঢুকে পড়ল জনপদে। মানুষ দৌড়লেন উঁচু জায়গার দিকে। কিন্তু অনেকেরই পালানোর সময়টুকুও হল না। চোখের সামনে স্ত্রী এবং ১৮ বছরের ছেলেকে হারিয়ে সেই ভয়াবহ মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইলেন নুয়াকোটের ত্রিশূলী বাজারের এক ব্যবসায়ী।
সেই ব্যবসায়ী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, স্রোত এত দ্রুত এসেছিল যে বুঝে ওঠার আগেই মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সকালে স্থানীয় প্রশাসনের তরফে বাসিন্দাদের সতর্ক করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তিব্বতের দিক থেকে ভোতে কোশি নদীতে বিপুল জল নেমে আসছে। সবাইকে যত দ্রুত সম্ভব অপেক্ষাকৃত উঁচু জায়গায় সরে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও হাতে ছিল মাত্র কয়েকটি মুহূর্ত।
তিনি বলেন, মানুষ তখন যে যার মতো দৌড়তে শুরু করেন। কেউ সন্তানকে কোলে নিয়েছেন, কেউ বৃদ্ধ বাবা-মাকে ধরে টানছেন। দোকানপাট ফেলে নিরাপদ জায়গার দিকে ছুটছিলেন সকলে। সেই সময়ই হু হু করে এগিয়ে আসে জলের স্রোত। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে তছনছ হয়ে যায় গোটা এলাকা। তাঁর স্ত্রী এবং ১৮ বছরের ছেলেও সেই স্রোতের মধ্যে হারিয়ে যান। এখনও তাঁদের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বৃষ্টি নেই, তবু ‘জলের দেওয়াল’!
সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয়, প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি—ঘটনার সময় এলাকায় তেমন বৃষ্টিই হয়নি। মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। আচমকাই নদীর দিক থেকে ভয়ঙ্কর গর্জন শুনতে পান তাঁরা। তার পরেই দেখা যায়, পাহাড়ের বুক চিরে যেন এগিয়ে আসছে বিশাল এক জলের দেওয়াল।
রসুয়ার প্রধান কাস্টমস আধিকারিক রাজেন্দ্র ঢুঙ্গানা জানিয়েছেন, তিনি প্রথমে মাটি কাঁপার মতো অনুভূতি পান। বাইরে বেরিয়ে দেখেন, উপর দিক থেকে প্রবল বেগে জল নেমে আসছে। তাঁর বর্ণনায়, জলের স্রোত যেন ঢেউয়ের মতো উঠে এসে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তিমুরে বাজারকে গ্রাস করে নেয়। কাস্টমস চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে থাকা ৩০০-রও বেশি গাড়ি ও ট্রাকও স্রোতে ভেসে যায়।
জলের সঙ্গে নেমেছে কাদা-পাথরের পাহাড়
শুধু জল নয়, তার সঙ্গে নেমে এসেছে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর এবং ধ্বংসাবশেষ। কোথাও বাড়ির একতলা পর্যন্ত পলি জমে গিয়েছে। কোথাও রাস্তা আর সেতুর অস্তিত্বই নেই। বহু জায়গায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন। ফলে উদ্ধারকারীদের পক্ষে দুর্গত এলাকায় পৌঁছনোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রসুয়া, নুয়াকোট এবং ধাদিং—নেপালের একাধিক জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এই আকস্মিক বন্যার আঘাতে বিপর্যস্ত। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে। নদীর তীরের বসতিগুলির বহু বাড়ি কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। কোথাও মানুষ ঘর ছেড়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছেন, কোথাও আবার প্রাণ বাঁচাতে গাছের ডালে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুলে থেকেছেন।
কী ভাবে এল এই বিপর্যয়?
প্রথমে ভূমিকম্পের সঙ্গে এই বিপর্যয়ের যোগ রয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল। পরে ভূ-বিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণে সামনে আসে অন্য ছবি। হিমালয়ের একটি বিশাল হিমবাহের ধস এবং তার জেরে জল ও ধ্বংসাবশেষের আকস্মিক স্রোত এই ভয়াবহ বন্যার অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। সেই জলধারা লেন্দে খোলা হয়ে ভোতে কোশি নদীতে নেমে আসে এবং তার পর ভয়ঙ্কর গতিতে নীচের জনপদগুলির দিকে ছুটে যায়।
অর্থাৎ, সাধারণ বর্ষার বন্যার মতো ধীরে ধীরে জল বাড়েনি। হঠাৎ তৈরি হওয়া এই ‘ফ্ল্যাশ ফ্লাড’-এর জন্যই মানুষকে পালানোর সুযোগ মেলেনি।
মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, নিখোঁজ বহু
নেপালের বিভিন্ন সরকারি হিসাব ও সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ১৬০-এর বেশি বলে জানা যাচ্ছে। শত শত মানুষ এখনও নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও রয়েছেন। নেপালের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৩০০ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন, যাঁদের অনেকেই মানসসরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন।
নদীর জল কিছু এলাকায় নেমে গেলেও বিপদ কাটেনি। বরং এখন শুরু হয়েছে আরও কঠিন লড়াই—কাদার স্তরের নীচে আটকে থাকা মানুষদের খুঁজে বার করা। সেনা, পুলিশ এবং উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। হেলিকপ্টারেও চলছে উদ্ধারকাজ। কিন্তু ভেঙে যাওয়া রাস্তা, সেতু এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছনো কঠিন হয়ে উঠেছে।
আর ত্রিশূলী বাজারের সেই ব্যবসায়ী? তাঁর সামনে এখন শুধু অপেক্ষা। হয়তো কোনও ধ্বংসস্তূপ সরালে মিলবে স্ত্রী-ছেলের খবর। হয়তো নদীর অন্য কোনও পাড়ে তাঁদের সন্ধান মিলবে। কিন্তু যে দৃশ্য তিনি নিজের চোখে দেখেছেন, তা কোনও দিন মুছে যাওয়ার নয় কয়েক সেকেন্ডের সেই জলের স্রোত তাঁর চোখের সামনে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে তাঁর সংসারের দুই আপনজনকে।