কাঠমান্ডু: এক দিকে ত্রিশূলীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, সেতু, রাস্তা। অন্য দিকে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে স্বজনদের খোঁজ করছেন অসহায় মানুষ। কোথাও উদ্ধার হচ্ছে মৃতদেহ, কোথাও এখনও নিখোঁজের অপেক্ষায় পরিবার। ভয়াবহ হড়পা বান ও বন্যায় যখন নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত ধ্বংসস্তূপ, তখন সেই বিপর্যয়ের মধ্যেই সামনে এল সম্পূর্ণ অন্য এক ছবি। বন্যার জলে ভেসে আসা একটি সিন্দুক উদ্ধার করে সেটি ভেঙে ভিতরের টাকা নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠল একদল স্থানীয়ের বিরুদ্ধে। পুলিশের তদন্তে এখনও পর্যন্ত ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে ৯২ লক্ষ ৬৮ হাজার ৫০৫ টাকা।
প্রকৃতির তাণ্ডবের সামনে মানুষ যখন বাঁচার লড়াইয়ে ব্যস্ত, তখনই নদীর স্রোতে ভেসে আসা ওই সিন্দুক যেন হয়ে উঠেছিল অন্য এক লোভের কেন্দ্র। পুলিশের দাবি, সিন্দুকটি খুলে ভিতরের নগদ টাকা বার করে নিয়ে গিয়েছিলেন কয়েক জন। খবর পেয়ে তদন্তে নামে ধাদিং জেলা পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তের পর একে একে ২৯ জনকে আটক করা হয়।
ঘটনার সূত্রপাত নেপালের রসুয়া জেলার ভোতেকোশি এলাকায়। প্রবল বন্যার স্রোতে একটি নগদ টাকাভর্তি সিন্দুক ভেসে যায়। পরে সেটির হদিস মেলে ধাদিং জেলার গালছি গ্রামীণ পুরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বেলখুখোলা এলাকায়, ত্রিশূলী নদীর কাছে। অর্থাৎ যে স্রোত মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি ছিনিয়ে নিয়েছে, সেই স্রোতই একটি ব্যাঙ্কের সিন্দুককে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে ফেলেছিল বহু দূরে।
এই ঘটনা সামনে আসার পর নেপালের ভয়াবহ বন্যার মধ্যে অপরাধের আরও একটি ভয়ংকর ছবি সামনে এসেছে। কয়েক দিন আগেই বন্যার জলে ভেসে আসা এক মহিলার মৃতদেহ থেকে সোনার কানের দুল খুলে নেওয়ার অভিযোগে দু’জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। সেই ঘটনার ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ, বিপর্যয়ের মাঝেও মৃতের দেহ থেকে গয়না খুলে নেওয়ার অভিযোগ, আবার কোথাও নদীর জলে ভেসে আসা সিন্দুক ভেঙে নগদ টাকা নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ—পরপর এই ঘটনাগুলি নেপালের বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সামনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এই বন্যা সাধারণ কোনও জলবন্দি পরিস্থিতি নয়। হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে ভয়াবহ হড়পা বানের ধাক্কায় বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত বিপর্যস্ত। সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই কয়েকশো ছাড়িয়েছে এবং নিখোঁজের সংখ্যাও বিপুল। উদ্ধারকাজে হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী ও সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তা ও সেতু এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বহু জায়গায় পৌঁছনোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই অবস্থায় প্রশাসনের মূল লক্ষ্য নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের উদ্ধার, মৃতদেহ শনাক্তকরণ এবং দুর্গতদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু তারই মধ্যে উদ্ধার হওয়া সম্পত্তি নিয়ে লুটপাটের অভিযোগ উঠলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে মানুষের অসহায়তাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধের ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু নেপালের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টির গুরুত্ব অন্য জায়গায়। কারণ, বহু পরিবার এখনও জানেই না তাঁদের বাড়িঘর, দোকান বা সম্পত্তির কী অবস্থা। অনেক জায়গায় মানুষ ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় বহু এলাকায় প্রশাসনের নজরদারিও সীমিত। ফলে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি দুর্গতদের সম্পত্তি রক্ষা এবং লুটপাট ঠেকানোও এখন পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ভোতেকোশি থেকে ত্রিশূলী—এই নদী অববাহিকাই সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কেন্দ্র। হঠাৎ জলস্তর বেড়ে গিয়ে নদীর স্রোত এতটাই ভয়াবহ আকার নেয় যে বহু মানুষ পালানোর সুযোগও পাননি। হিমবাহ বা বরফ-পাথরের ধস থেকে তৈরি প্রবল জলস্রোতের সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। নদীর জল দ্রুত বেড়ে গিয়ে রাস্তা, সেতু এবং বসতি কার্যত গ্রাস করেছে।
নেপাল-চিন সীমান্তের এই বিপর্যয়ের অভিঘাত শুধু প্রাণহানিতেই থেমে নেই। পরিকাঠামোর বিপুল ক্ষতি হয়েছে। বহু সেতু ও রাস্তা ধ্বংস হওয়ায় উদ্ধারকাজে বাধা তৈরি হয়েছে। পর্যটন ও তীর্থযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ পথগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ভয়াবহতার মধ্যেই সিন্দুক লুটের অভিযোগ যেন আরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, দুর্যোগের সময়ে মানুষের মানবিকতার পরীক্ষা হয়, কিন্তু সেই পরীক্ষায় সবাই কি উত্তীর্ণ হচ্ছেন?
একটি সিন্দুক নদীর স্রোতে ভেসে এসেছে। কেউ সেটিকে প্রশাসনের হাতে তুলে দিতে পারতেন। তার বদলে সেটি ভেঙে নগদ টাকা নিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের তৎপরতায় ইতিমধ্যে ২৯ জন আটক এবং ৯২ লক্ষের বেশি টাকা উদ্ধার হয়েছে। এখন তদন্তের অপেক্ষা, সিন্দুকে মোট কত টাকা ছিল, আর তার কতটা এখনও নিখোঁজ।
প্রকৃতির তাণ্ডবে নেপাল যখন মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা গুনছে, তখন কেউ কেউ সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও গুনছিলেন নোট। এই বৈপরীত্যই হয়তো এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছবিগুলির একটি।