নয়াদিল্লি: পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার তদন্তে এ বার সরাসরি পাকিস্তানের মাটিতে পৌঁছতে চলেছে ভারতের আইনি প্রক্রিয়া। লস্কর-ই-তইবার প্রতিষ্ঠাতা তথা পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি হাফিজ সইদকে আদালতের সমন পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)। কূটনৈতিক পথে পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের মাধ্যমে ওই সমন পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। ফলে পহেলগাঁও হামলার তদন্তে পাকিস্তান-যোগের অভিযোগকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লি-ইসলামাবাদ সংঘাত আরও এক ধাপ বাড়ল।
NIA-র অতিরিক্ত চার্জশিটে হাফিজকে ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত করা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, লস্কর-ই-তইবার পাশাপাশি তাদের সক্রিয় ছায়া সংগঠন ‘দ্য রেজ়িস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ (TRF)-এর সঙ্গেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে। পহেলগাঁও হামলার নেপথ্যে সীমান্তের ওপার থেকে পরিচালিত বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবেই হাফিজের নাম চার্জশিটে আনা হয়েছে।
এই মামলায় হাফিজের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই জামিন-অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে জম্মুর বিশেষ NIA আদালত। জুলাইয়ে অতিরিক্ত চার্জশিট পেশ করার পরেই আদালত ওই পদক্ষেপ করে। কিন্তু হাফিজ পাকিস্তানে থাকায় তাঁকে ভারতে এনে জিজ্ঞাসাবাদ বা বিচারপ্রক্রিয়ায় হাজির করানো এখনও সম্ভব হয়নি। সেই পরিস্থিতিতেই এ বার আদালতের সমন পাকিস্তানে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ।
NIA সূত্রের বক্তব্য, আদালতের জারি করা নথি সরাসরি পাকিস্তানে পাঠানোর বদলে কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করা হবে। অর্থাৎ ভারতের বিদেশ মন্ত্রক পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের কাছে সমন পাঠাবে। সেখান থেকে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হাফিজের কাছে তা পৌঁছনোর কথা। এই প্রক্রিয়া কার্যকর হলে পহেলগাঁও মামলায় অভিযুক্ত এক পাকিস্তান-ভিত্তিক শীর্ষ জঙ্গির বিরুদ্ধে ভারতের বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক স্তরেও নতুন মাত্রা পাবে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল। জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় পর্যটকদের উপর জঙ্গি হামলায় ২৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ২৫ জন পর্যটক এবং এক স্থানীয় বাসিন্দা। তদন্তে NIA পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলির ভূমিকার দিকে নজর দেয়। পরে তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে হাফিজ সইদের নামও সামনে আনা হয়।
জুলাইয়ে NIA-র অতিরিক্ত চার্জশিটে হাফিজকে অভিযুক্ত করার পর ভারতের অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। NIA-র দাবি, তাঁকে শুধু ব্যক্তিগত ভাবে নয়, লস্কর-ই-তইবা এবং TRF-এর নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করেও ষড়যন্ত্রের অংশ হিসাবে দেখা হয়েছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই আদালতের কাছ থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা আদায় করা হয়।
তবে ইসলামাবাদ ইতিমধ্যেই ভারতের এই তদন্ত ও হাফিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রক হাফিজের বিরুদ্ধে ভারতের তদন্তকে প্রশ্ন করেছে এবং তাঁকে প্রকাশ্যে সমর্থনও করেছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে। ফলে সমন পৌঁছনোর পর পাকিস্তান কী পদক্ষেপ করে, সেটিই এখন নজরে।
আইনি দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানে থাকা অভিযুক্তকে ভারতে এনে আদালতে হাজির করানো না গেলেও ভারতীয় আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অনুপস্থিত অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিচার চালানোর পথ খোলা রয়েছে। সেই কারণেই হাফিজকে সমন পাঠানোর পদক্ষেপকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা হিসাবে দেখছে না তদন্তকারী সংস্থা। বরং অভিযুক্তকে আদালতের সামনে হাজির করার আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসাবেই দেখা হচ্ছে।
অর্থাৎ পহেলগাঁও হামলার তদন্ত এ বার শুধু কাশ্মীরের মাটিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পাকিস্তানে থাকা অভিযুক্তের দরজায় ভারতের আদালতের নোটিস পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি—সীমান্তপারের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নয়াদিল্লির আইনি ও কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোরই ইঙ্গিত। হাফিজের বিরুদ্ধে সমন পৌঁছয় কি না, পাকিস্তান তার জবাব দেয় কী ভাবে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে ভারতীয় বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি করা সম্ভব হয় কি না—এই তিন প্রশ্নেই এখন নজর।