নিউজ ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দুনিয়ায় পরিচিত নাম ওপেনএআই। সেই সংস্থারই দফতরে গোপনে কথোপকথন রেকর্ড করার যন্ত্র বসানোর অভিযোগ সামনে আসায় শোরগোল পড়েছে প্রযুক্তি মহলে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, সংস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকঘরে রেকর্ডিং যন্ত্র বসিয়েছিলেন প্রাক্তন কর্মী আবদুলরহমান আলফোজান। ৩৫ বছর বয়সি ওই সৌদি নাগরিককে ৯ অক্টোবর গ্রেফতার করা হয়। পরে প্রকাশ্যে আসে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগের বিবরণ।
ঘটনার সূত্রপাত ৩০ সেপ্টেম্বর।
সান ফ্রান্সিসকোয় ওপেনএআইয়ের একটি দফতরের এক্সিকিউটিভ কনফারেন্স রুমে সন্দেহজনক একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র দেখতে পান সংস্থার কর্মীরা। টেলিভিশনের পিছনে ইউএসবি পোর্টে লাগানো ছিল সেটি। তদন্তকারীদের দাবি, যন্ত্রটিকে টিস্যু পেপার দিয়ে মুড়ে আড়াল করা হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সেটি সেখানে বসানো হয়েছিল।
ওই ঘরে সাধারণত সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্তাদের বৈঠক হত। ফলে সেখানে গোপনে কথোপকথন রেকর্ড করা হয়ে থাকলে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আলোচনা এবং অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা ছিল। যদিও যন্ত্রটি উদ্ধার হওয়ার পরেও তার মাধ্যমে সত্যিই কোনও বৈঠকের কথাবার্তা রেকর্ড করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হয়নি।
সন্দেহের সূত্র কোথায়?
মার্কিন তদন্তকারীদের দাবি, ওপেনএআইয়ের দফতরে যন্ত্রটি উদ্ধারের পর তার উৎস খুঁজতে শুরু করে সংস্থার নিরাপত্তা বিভাগ। সেই তদন্তে আলফোজানের নাম উঠে আসে। পরে বিষয়টি জানানো হয় এফবিআইকে। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সংস্থার দফতর, বৈঠকঘর এবং উচ্চপদস্থ কর্তাদের অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিলেন অভিযুক্ত। বৈঠকের সময়সূচি এবং ঘরগুলির অবস্থান সম্পর্কেও অনুসন্ধান করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি।
এ ছাড়াও, ৫ অক্টোবরের সিসিটিভি ফুটেজে আলফোজানকে সংশ্লিষ্ট বৈঠকঘরে প্রবেশ করতে দেখা গিয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। ওই দিন সংস্থার অন্য একটি ঘরে তাঁর ব্যাগও পাওয়া যায়। নিরাপত্তাকর্মীরা ব্যাগটি পরীক্ষা করে তার মধ্যে আরও একটি রেকর্ডিং যন্ত্র খুঁজে পান বলে দাবি তদন্তকারীদের। দুটি যন্ত্রের মধ্যে প্রযুক্তিগত মিল ছিল কি না এবং সেগুলি একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার পরিকল্পনা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের আওতায় রয়েছে। তবে তদন্তকারীদের অভিযোগ এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
প্রযুক্তিগত প্রশ্ন থেকেই কি তদন্তের মোড়?
ঘটনাটির তদন্তে আরও একটি সূত্র সামনে এসেছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আলফোজানের স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি চ্যাটবট অ্যাকাউন্ট থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে অডিয়ো রেকর্ডিং যন্ত্র তৈরি এবং তার কার্যকারিতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করা হয়েছিল। অভিযোগ, ওই অ্যাকাউন্টে যন্ত্রের রেকর্ডিং ক্ষমতা, তথ্য সংরক্ষণ, সংযোগ ব্যবস্থা এবং দূর থেকে সেটি পরিচালনা করার মতো বিষয় নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল।
তদন্তকারীরা এই অনুসন্ধানের সঙ্গে উদ্ধার হওয়া যন্ত্রগুলির সম্ভাব্য সম্পর্ক খতিয়ে দেখছেন। তবে কোনও অ্যাকাউন্ট থেকে প্রযুক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেই তা অপরাধের প্রমাণ হয়ে যায় না। ওই প্রশ্নগুলি কে করেছিলেন, কী উদ্দেশ্যে করেছিলেন এবং তার সঙ্গে ঘটনাটির প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেগুলি তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
কে এই আবদুলরহমান আলফোজান?
আলফোজান ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ওপেনএআইয়ে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর ব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো নিয়ে কাজ করতেন তিনি। তাঁর আগের কর্মজীবনের সঙ্গে মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তি সংস্থার নামও জড়িয়েছে।
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের বিস্তারিত বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি। মামলায় তাঁর আইনজীবীর বক্তব্যও তাৎক্ষণিক ভাবে পাওয়া যায়নি বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীদের অভিযোগ, সংস্থার অভ্যন্তরীণ বৈঠকে আড়ি পাতার উদ্দেশ্যে যন্ত্র বসানো হয়েছিল। কিন্তু এর পিছনে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, অন্য কেউ এই কাজে যুক্ত ছিলেন কি না এবং সংগৃহীত কোনও তথ্য বাইরে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
চ্যাটজিপিটির সাহায্যেই সূত্র মিলল?
ঘটনার আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, উদ্ধার হওয়া যন্ত্রটির প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করতে ওপেনএআই নিজেদের এআই মডেলের সাহায্য নিয়েছিল বলে জানিয়েছে। সংস্থার দাবি, যন্ত্রটির উৎস অনুসন্ধানের কাজে সেই প্রযুক্তি সহায়ক হয়েছিল। পরে প্রাপ্ত তথ্য নিরাপত্তা বিভাগ পরীক্ষা করে এবং তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেয়।
তবে শুধু এআইয়ের সাহায্যেই অভিযুক্তকে শনাক্ত করা হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো তথ্য প্রকাশ্যে নেই। যন্ত্রের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা, সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়েই তদন্ত এগিয়েছে বলে অভিযোগপত্রের বিবরণ থেকে বোঝা যায়।
এখানে প্রশ্ন উঠছে, এআই প্রযুক্তি যেমন অপরাধ শনাক্তকরণে সহায়তা করতে পারে, তেমনই সেই প্রযুক্তি ব্যবহারকারী সংস্থাগুলির নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও কি আরও বাড়ছে না?
গোপন তথ্য চুরির প্রমাণ মেলেনি, দাবি সংস্থার
ওপেনএআইয়ের বক্তব্য, এখনও পর্যন্ত এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে আলফোজান সংস্থার গোপন এআই মডেল, প্রযুক্তিগত নকশা, সোর্স কোড কিংবা গ্রাহকদের তথ্য চুরি করেছেন বা বাইরে পাঠিয়েছেন। ঘটনার পরে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। তদন্তে এফবিআইকে সহযোগিতা করছে সংস্থা।
তবে গোপন রেকর্ডিংয়ের অভিযোগ এবং প্রযুক্তিগত তথ্য চুরির অভিযোগ এক নয়। যন্ত্রটি বসানোর উদ্দেশ্য, সেটি কার্যকর হয়েছিল কি না এবং কোনও কথোপকথন সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না— এই প্রশ্নগুলির উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে না।
দোষী সাব্যস্ত হলে কী শাস্তি?
মার্কিন কর্তৃপক্ষের দায়ের করা অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে আলফোজানের সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং আড়াই লক্ষ ডলার জরিমানা হতে পারে। পাশাপাশি, মুক্তির পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাঁর উপর আদালতের তত্ত্বাবধান থাকার বিধানও প্রযোজ্য হতে পারে। তবে এগুলি সম্ভাব্য সর্বোচ্চ শাস্তি। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া, বিচারপ্রক্রিয়া এবং আদালতের সিদ্ধান্তের উপরেই চূড়ান্ত শাস্তি নির্ভর করবে।
এই ঘটনা প্রযুক্তি সংস্থাগুলির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। সাইবার আক্রমণ থেকে তথ্য রক্ষা করার পাশাপাশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার, বৈঠকঘরের নিরাপত্তা এবং সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির উপর নজরদারিও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, তা আরও এক বার সামনে এল।
ওপেনএআইয়ের দফতরে ঠিক কী ঘটেছিল, কোনও কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছিল কি না এবং অভিযুক্তের উদ্দেশ্য কী ছিল— তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই প্রশ্নগুলির উত্তর অধরা। আপাতত একটি ছোট ইলেকট্রনিক যন্ত্রকে ঘিরে শুরু হওয়া তদন্ত প্রযুক্তি দুনিয়ায় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
