নয়াদিল্লি: বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের আবহে ফের আলোচনার কেন্দ্রে শেখ হাসিনা। ভারতে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি নিয়ে মুখ খুলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কোনও এক জন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত বা অবস্থানের উপর নির্ভর করে চলতে পারে না। বাংলাদেশের ব্রিকস সম্মেলন এড়িয়ে যাওয়াকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে উল্লেখ করে হাসিনা মনে করিয়ে দিয়েছেন, এই ধরনের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ এনে দিতে পারত।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর আয়োজিত হয়েছিল ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ভারত এ বার সম্মেলনের আয়োজক দেশ। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলির পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতার বিভিন্ন মঞ্চের প্রতিনিধিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই সূত্রেই বিমসটেকের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশকে সম্মেলনের আলোচনায় যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল নয়াদিল্লি। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেয়নি।
ঢাকার এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হাসিনার বক্তব্য, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের কাছে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মঞ্চগুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন দেশের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা, বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা খোঁজা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার পথ প্রশস্ত করার সুযোগ থাকে। সেই সুযোগ থেকে বাংলাদেশ নিজেকে সরিয়ে রাখায় দেশেরই ক্ষতি হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
ব্রিকস সম্মেলন ঘিরে দিল্লি-ঢাকা সংঘাত
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি শুধুমাত্র একটি কূটনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ না দেওয়ার ঘটনা নয়। এর পিছনে রয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপড়েন, হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁকে বাংলাদেশে ফেরানোর দাবিকে ঘিরে জটিলতা। ২০২৪ সালের অগস্টে গণআন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে চলে আসেন শেখ হাসিনা। তার পর থেকে তিনি ভারতেই রয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে। অন্য দিকে, হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক তৈরি করেছে।
তারেক রহমানের সরকার মনে করে, হাসিনা এবং তাঁর দলের নেতাদের ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও সম্প্রতি জানিয়েছেন, হাসিনা ও তাঁর সহযোগীদের ভারতে অবস্থান এবং তাঁদের কার্যকলাপ তারেক রহমানের ভারত সফরের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতিতে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের অবস্থানেও পার্থক্য দেখা যায়। নয়াদিল্লির বক্তব্য, তারেক রহমানকে ব্রিকস সম্মেলনের একটি বিশেষ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে। পাশাপাশি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য পৃথক দ্বিপাক্ষিক আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল।
কিন্তু ঢাকার বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর কোনও বহুপাক্ষিক সম্মেলনের অংশ হিসেবে হওয়া উচিত নয়। বরং দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক সফরের মাধ্যমেই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া প্রয়োজন। এই অবস্থান থেকেই ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সরকার।
‘এক ব্যক্তির জন্য সম্পর্ক আটকে থাকতে পারে না’
হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধকে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় করে তোলা উচিত নয়। দুই দেশের সম্পর্ক নির্ভর করে পারস্পরিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক বোঝাপড়ার উপর। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্য, দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি সহযোগিতার গুরুত্ব রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হলে তার প্রভাব শুধু রাজনৈতিক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য পরিবহণ, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জীবন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার উপরেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
হাসিনার যুক্তি, ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিত থাকার মাধ্যমে বাংলাদেশ বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ পেতে পারত। সেখানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। বিনিয়োগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্যের নতুন ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।
তবে হাসিনার এই বক্তব্যকে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ, তারেক রহমানের সরকার এক দিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলছে, অন্য দিকে হাসিনার ভারতে অবস্থানকে সেই প্রক্রিয়ার অন্যতম বাধা হিসেবে তুলে ধরছে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সামনে একাধিক অমীমাংসিত প্রশ্ন
দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের কেন্দ্রে শুধু হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন নেই। বাণিজ্য, জ্বালানি, ভিসা পরিষেবা, সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যা এবং গঙ্গার জলবণ্টন চুক্তির মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের রফতানি, বিশেষ করে পোশাক শিল্পের জন্য আঞ্চলিক বাজার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। অন্য দিকে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভূগোল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ ফের সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত এগোবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি কতটা দূর করা যায় তার উপর। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার চাইছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় থাকুক। অন্য দিকে, নয়াদিল্লির কাছে প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা কৌশলগত ও অর্থনৈতিক— দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিকসের মঞ্চে অনুপস্থিতি কতটা বড় ক্ষতি?
ব্রিকস বর্তমানে উদীয়মান অর্থনীতিগুলির মধ্যে সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। এর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ভারত, চিন, রাশিয়া, ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পাশাপাশি সম্প্রসারিত গোষ্ঠীর আরও কয়েকটি দেশ। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, উন্নয়ন, জ্বালানি এবং ভূরাজনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে এই মঞ্চের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়। তবে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে সম্মেলনের বিশেষ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ছিল তারেক রহমানের সরকারের সামনে। সেই সুযোগ কাজে লাগালে বাংলাদেশের পক্ষে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলি নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হত।
তবে বাংলাদেশের অনুপস্থিতিকে সরাসরি অর্থনৈতিক ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করার আগে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। কোনও আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিলেই বিনিয়োগ বা বাণিজ্যের সুযোগ নিশ্চিত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন পরবর্তী পর্যায়ে ধারাবাহিক কূটনৈতিক আলোচনা, উপযুক্ত নীতি এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ। ফলে ব্রিকস সম্মেলনে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে একটি সম্ভাব্য সুযোগ হারানো হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু তার আর্থিক প্রভাব কতটা হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।
হাসিনার বক্তব্যে নতুন রাজনৈতিক বার্তা
শেখ হাসিনার এই মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে। তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা হলেও দুই দেশের মধ্যে আস্থার ঘাটতি এখনও পুরোপুরি কাটেনি। হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি এবং দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পারস্পরিক অবস্থান এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। হাসিনার বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজের অবস্থানকেও আলোচনার কেন্দ্রে রাখছেন। অন্য দিকে, ঢাকার কাছে তাঁর ভারতে অবস্থান এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন।
সব মিলিয়ে, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কের বৃহত্তর টানাপড়েনেরই প্রতিফলন। হাসিনা এই সিদ্ধান্তকে দুর্ভাগ্যজনক বলে সমালোচনা করেছেন। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু এই একটি সম্মেলনকে ঘিরে বিতর্কের উপর নয়, বরং বাণিজ্য, জলবণ্টন, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক আস্থার মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলি দুই দেশ কী ভাবে সমাধান করে তার উপর। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক স্বার্থকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া যায়, এখন সেটাই দিল্লি ও ঢাকার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
