নিউজ ডেস্ক: কোথাও গভীর শ্মশানের নিস্তব্ধতা, ধুনির আগুন আর তন্ত্রসাধনার কঠিন অনুশীলন। আবার কোথাও গঙ্গার তীরে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, ভক্তের প্রার্থনা আর মায়ের কাছে আত্মসমর্পণ। বাংলার আধ্যাত্মিক মানচিত্রে তারাপীঠ ও দক্ষিণেশ্বর দুই জায়গার মাহাত্ম্যই অপরিসীম। একদিকে বীরভূমের তারাপীঠ, যেখানে দেবী তারা আরাধিত হন তান্ত্রিক সাধনার বিশেষ ঐতিহ্যে। অন্যদিকে কলকাতার কাছে দক্ষিণেশ্বর, যেখানে মা ভবতারিণীর চরণে আশ্রয় খুঁজে পান হাজার হাজার ভক্ত। কিন্তু এই দুই পীঠের আরাধনার ইতিহাস কী? কীভাবে বাংলায় শক্তিসাধনা ও মাতৃভক্তির এমন বিস্তার ঘটল?
তারাপীঠ: শ্মশানের নিস্তব্ধতায় দেবী আরাধনার এক অন্য জগৎ
বীরভূমের দ্বারকা নদীর কাছে অবস্থিত তারাপীঠ শুধু একটি মন্দির নয়, বাংলার তন্ত্রসাধনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে দেবী কালী নন, আরাধিত হন দেবী তারা, যিনি দশমহাবিদ্যার অন্যতম রূপ। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দফতরের তথ্য অনুযায়ী, তারাপীঠের মন্দিরের ইতিহাস ১৩শ শতকের সঙ্গে যুক্ত। মন্দিরের পাশেই রয়েছে বিখ্যাত মহাশ্মশান, যেখানে বহু প্রজন্ম ধরে তান্ত্রিক সাধনা ও বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালিত হয়ে আসছে।
তারাপীঠের অন্যতম পরিচিত নাম সাধক বামাক্ষ্যাপা। উনিশ শতকের এই সাধক নিজের জীবন দেবী তারার আরাধনায় উৎসর্গ করেছিলেন। কথিত আছে, শ্মশানের কঠিন পরিবেশেও তিনি মায়ের ধ্যান ও সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন। তাঁর জীবনকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য অলৌকিক কাহিনি ও লোকবিশ্বাস। আজও তারাপীঠে গেলে মন্দিরের পাশাপাশি বামাক্ষ্যাপার স্মৃতিমন্দির ও মহাশ্মশান দর্শন করতে আসেন অসংখ্য মানুষ।
দক্ষিণেশ্বর: রানি রাসমণির স্বপ্ন থেকে ভবতারিণীর মন্দির
অন্যদিকে, দক্ষিণেশ্বরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক মহীয়সী নারীর নাম রানি রাসমণি। ১৮৪৭ সালে কাশী যাওয়ার প্রস্তুতির সময় দেবী কালীর স্বপ্নাদেশ পাওয়ার কথা প্রচলিত রয়েছে। সেই স্বপ্নের অনুপ্রেরণাতেই গঙ্গার তীরে মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন তিনি।
প্রায় আট বছরের নির্মাণকাজের পর ১৮৫৫ সালের ৩১ মে, স্নানযাত্রার পুণ্যতিথিতে প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণেশ্বরের মন্দির। এখানে দেবী পূজিত হন ভবতারিণী নামে। বাংলার নবরত্ন স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মন্দিরের সঙ্গে রয়েছে বারোটি শিবমন্দির এবং রাধাকান্তের মন্দির।
দক্ষিণেশ্বরের ইতিহাসে আর এক উজ্জ্বল অধ্যায় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। এই মন্দিরেই দীর্ঘদিন সাধনা করেছেন তিনি। তাঁর আধ্যাত্মিক উপলব্ধি, মাতৃভক্তি এবং বিভিন্ন ধর্মপথের সাধনা দক্ষিণেশ্বরকে শুধু একটি তীর্থস্থান নয়, এক অনন্য আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তন্ত্রসাধনা থেকে মাতৃভক্তি: বদলে গিয়েছে আরাধনার প্রকাশ
বাংলায় শক্তিসাধনার ইতিহাস বহু প্রাচীন। শাক্তধর্মের তান্ত্রিক ধারায় দেবীকে মহাশক্তিরূপে কল্পনা করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সাধনার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে ভক্তিমূলক মাতৃআরাধনার প্রসার ঘটে। অষ্টাদশ শতকের সাধক রামপ্রসাদ সেনের শ্যামাসংগীত এবং পরবর্তী সময়ে শ্রীরামকৃষ্ণের মাতৃসাধনা বাংলার মানুষের কাছে মা কালীর স্নেহময়ী রূপকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে।
তারাপীঠের সাধনভূমি আর দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির তাই বাংলার শক্তি আরাধনার দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একদিকে সাধনার গভীরতা, অন্যদিকে ভক্তির আত্মসমর্পণ, দুই ধারাই মিশে রয়েছে বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে।
দুই পীঠ, দুই পরিবেশ, কিন্তু বিশ্বাসের কেন্দ্রে সেই মাতৃশক্তি
তারাপীঠের মহাশ্মশান হোক কিংবা দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গাতীর, দুই জায়গাতেই ভক্তের আরাধনার কেন্দ্রে রয়েছেন দেবী। একজনের কাছে তিনি তারা, অন্যজনের কাছে ভবতারিণী। রূপ ও সাধনপদ্ধতিতে পার্থক্য থাকলেও মাতৃশক্তির প্রতি বিশ্বাসই এই দুই পীঠকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছে। আর সেই বিশ্বাসের টানেই যুগের পর যুগ বাংলার মানুষ ছুটে যান মায়ের চরণে, একটুকরো শান্তি আর আশীর্বাদের আশায়।




