বিশেষ প্রতিবেদন: প্রকৃতির দুর্যোগে যখন মানুষেরই যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে, তখন বিপাকে পড়ে বন্যপ্রাণীদের দেখভালও। এ বার সেই সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তির সাহায্য নিল আমেরিকার ফ্লরিডার একটি শিম্পাঞ্জি অভয়ারণ্য। প্রবল বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়েছিল অভয়ারণ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। ডুবে গিয়েছিল ভিতরের রাস্তাঘাট। ফলে খাবার নিয়ে শিম্পাঞ্জিদের কাছে পৌঁছনো কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত ড্রোনের সাহায্যে এক বিচ্ছিন্ন শিম্পাঞ্জির কাছে পৌঁছে দেওয়া হল কলা ও কম্বল।
সেই দৃশ্যের ভিডিও ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে নেটদুনিয়ায়। ঘটনাটি ফ্লরিডার ফোর্ট পিয়ার্স এলাকার ‘সেভ দ্য শিম্পস’ অভয়ারণ্যের। প্রায় ১৫০ একর জমির উপর গড়ে ওঠা এই আশ্রয়স্থলে রয়েছে ২০০-রও বেশি উদ্ধার করা শিম্পাঞ্জি। গবেষণাগার, পোষ্য প্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য এবং বিনোদন জগতের নানা জায়গা থেকে উদ্ধার হওয়া এই প্রাণীদের স্থায়ী আশ্রয় দেয় সংস্থাটি। কিন্তু নভেম্বরের শুরুতে দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য ফ্লরিডায় প্রবল বৃষ্টিতে অভয়ারণ্যের বিস্তীর্ণ অংশ প্লাবিত হয়। উপচে পড়ে খাল ও জলনিকাশি ব্যবস্থা। জলের তলায় চলে যায় ভিতরের রাস্তাগুলি।
https://www.instagram.com/reel/DfapHx0PhGk/?utm_source=ig_web_copy_link&exln=NTc4MTIwNjQ2YQ==
সাধারণত গল্ফ কার্টে করে প্রতিদিন প্রায় ৩,০০০ পাউন্ড বা ১,৩৬১ কেজি খাবার পৌঁছে দেওয়া হয় শিম্পাঞ্জিদের কাছে। কিন্তু রাস্তা ডুবে যাওয়ায় সেই ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। উঁচু জল পেরোনোর উপযোগী একটি বিশেষ গাড়ি বা ‘সোয়াম্প বাগি’ দিয়ে প্রথমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সেটিও বিকল হয়ে যায়। ফলে অভয়ারণ্যের একটি অংশে আটকে পড়া প্রাণীদের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে ৩৮ বছর বয়সি শিম্পাঞ্জি কালেব। জল জমে যাওয়ায় যে জায়গায় সে ছিল, সেখান থেকে কর্মীদের পক্ষে পৌঁছনো সম্ভব হচ্ছিল না। তখনই কাজে লাগানো হয় আগে থেকে কেনা একটি ডেলিভারি ড্রোন। কর্মীরা একটি কাগজের ব্যাগে খাবার ভরে ড্রোনের মাধ্যমে কালেবের কাছে পাঠিয়ে দেন। ব্যাগ থেকে কলা বের করে খেতে দেখা যায় তাকে। শুধু খাবার নয়, ঠান্ডা ও ভেজা পরিবেশে যাতে তার অসুবিধা না হয়, সে জন্য ড্রোনে করে পৌঁছে দেওয়া হয় কম্বলও।
অভয়ারণ্যের কর্মীদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে সেই মুহূর্ত। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ড্রোন থেকে নামানো খাবারের ব্যাগের কাছে এগিয়ে যাচ্ছে কালেব। সেখান থেকে কলা বের করে নিশ্চিন্তে খাচ্ছে সে। পরে জল জমে থাকা অংশ পেরোতে একটি দড়ি দিয়ে তৈরি সংযোগপথ ধরে এগোতেও দেখা যায় তাকে। অর্থাৎ, ড্রোনের সাহায্যে খাবার পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি নিজের মতো করে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার পথও খুঁজে নেয় শিম্পাঞ্জিটি।
তবে শুধু ড্রোনের উপর নির্ভর করেনি অভয়ারণ্য কর্তৃপক্ষ। বাকি শিম্পাঞ্জিদের কাছে খাবার, ওষুধ এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হয়েছে ট্রাক, ট্রাক্টর এবং কর্মীদের ব্যক্তিগত গাড়িও। সংস্থার প্রধান নির্বাহী আধিকারিক আনা পাওলা তাভারেস জানিয়েছেন, শিম্পাঞ্জিদের থাকার ঘরগুলি উঁচু জায়গায় হওয়ায় তারা নিরাপদেই ছিল। কয়েক জন পশুচিকিৎসক ও কর্মী প্রাণীদের দেখভালের জন্য রাতেও অভয়ারণ্যে থেকে যান।
সংস্থার পরিকাঠামো বিভাগের প্রধান মার্ক ইয়োহানান জানিয়েছেন, বন্যার জেরে খাবার সরবরাহের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ব্যাহত হলেও কোনও শিম্পাঞ্জিকে নিয়মিত খাবার বা ওষুধ থেকে বঞ্চিত হতে হয়নি। তাঁর কথায়, কলা ও কমলালেবু-সহ প্রয়োজনীয় খাবার সময়মতো পাচ্ছে প্রাণীরা। তাদের দৈনন্দিন পরিচর্যাতেও বড় কোনও ছেদ পড়েনি।
বন্যার প্রভাব অবশ্য অভয়ারণ্যের বাইরেও পড়েছে। জল জমে থাকায় কর্মীদের যাতায়াত কঠিন হয়ে উঠেছে। শুক্রবার অভয়ারণ্যের রান্নাঘরের কাছে একটি ছোট অ্যালিগেটর বা কুমিরজাতীয় সরীসৃপকেও দেখা যায়। জল বেড়ে যাওয়ায় সেটি স্বাভাবিক বাসস্থান ছেড়ে ওই এলাকায় চলে এসেছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
শনিবারের মধ্যে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। রাতারাতি জলস্তর অনেকটা কমেছে এবং অভয়ারণ্যের প্রায় ২০ শতাংশ রাস্তা ফের চলাচলের উপযোগী হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, ভবন ও সরঞ্জাম মেরামতির জন্য এখনও প্রয়োজনীয় অর্থ ও সাহায্যের অপেক্ষায় রয়েছে সংস্থাটি। সাধারণ মানুষের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদনও জানানো হয়েছে। এক দাতা ওই অনুদানের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘সেভ দ্য শিম্পস’ এখনও পর্যন্ত প্রায় ৩৫০টি শিম্পাঞ্জিকে আশ্রয় দিয়েছে। উদ্ধার হওয়া প্রাণীদের নিরাপদ জীবন দেওয়াই সংস্থার মূল লক্ষ্য। ফ্লরিডার এই বন্যা ফের দেখিয়ে দিল, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ শুধু আশ্রয় তৈরি করলেই শেষ হয় না। বিপর্যয়ের সময় তাদের কাছে খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও জরুরি। আর সেই কাজে এ বার ড্রোন হয়ে উঠল এক বিচ্ছিন্ন শিম্পাঞ্জির কাছে কার্যত আকাশপথের ত্রাতা।




