নিউজ ডেস্ক: সময়কে কে সৃষ্টি করেছেন? মহাবিশ্বের জন্মের আগে কী ছিল? সৃষ্টির আদি রহস্যের সন্ধানে বারবার উঠে এসেছে এক রহস্যময় আধ্যাত্মিক সত্তার নাম মহাকাল। শাক্ত দর্শন ও তন্ত্রসাধনায় তিনি কেবল সময়ের নিয়ন্তা নন, বরং মহাশক্তি কালীর পরম পুরুষ সত্তা। তাঁর অস্তিত্ব, শক্তি ও কালীতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের এক গভীর দর্শন। সনাতন ধর্ম ও শাক্ত দর্শনের এক গভীর আধ্যাত্মিক দিক উন্মোচিত হয়েছে মহাকাল তত্ত্বের আলোচনায়।
চালচিত্রের সকল দেবদেবীর নায়ক এবং শাক্তকুলের আদি গুরুদেব হিসেবে গণ্য করা হয় ‘কালাধিকাল মহাকাল’কে। তিনি কেবল সময়ের নিয়ন্তা নন, বরং প্রপঞ্চময়ী মহাশক্তি কালীর পুরুষ সত্তা এবং সমস্ত সৃষ্টির আদি উৎস। সকল সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন অব্যক্ত পুরুষ। শাক্ত ও তন্ত্রসাধকদের মতে, মহাকাল কোনও সাধারণ অবয়ব বা সীমানায় আবদ্ধ নন। তিনি সকল সংজ্ঞার ঊর্ধ্বে এবং সম্পূর্ণরূপে ‘অব্যক্ত’। সৃষ্টির পূর্বে যখন কোনও কিছুর অস্তিত্ব ছিল না, তখন কেবল তিনিই বিরাজমান ছিলেন। তিনি কাল বা সময়কে গ্রাস করেন বলেই তাঁর নাম মহাকাল।
পুরাণমতে, মহাকাল ও কালীর রমণেই হয়েছিল মহাবিশ্বের সৃষ্টি। শাক্ত সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী, নিষ্ক্রিয় মহাকাল এবং সক্রিয় মহাশক্তি কালীর আদি মিলনেই এই অনন্ত মহাজগতের জন্ম। শক্তি ছাড়া শিব যেমন ‘শব’ বা জড়বৎ, তেমনই শিব ছাড়া শক্তির কোনও প্রকাশ বা ভিত্তি নেই। এই পরম পুরুষ ও পরম প্রকৃতির সামরস্য বা মিলন থেকেই দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি ঘটে।
সময়, নাদ এবং অণু-পরমাণুর মূল কারণ
তাত্ত্বিক আলোচনা থেকে জানা যায়, সৃষ্টির সূচনালগ্নে যে স্পন্দন বা ‘নাদ’ (শব্দ) তৈরি হয়েছিল, তা এই আদি সত্তারই প্রকাশ। সময় (Time), নাদ (Sound), কলা (Attributes), বিন্দু (The cosmic point) এবং বাক্ (Speech) থেকে শুরু করে আজকের বিজ্ঞানসম্মত অণু-পরমাণুর মূল চালিকাশক্তি ও কারণ হলেন এই মহাকাল। আধ্যাত্মিক গবেষকদের মতে, এই তত্ত্ব কেবল কোনও পৌরাণিক গল্প নয়, বরং এটি সৃষ্টির এক গভীর বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক রূপক।
জগৎ-সংসারের সমস্ত গতি ও স্থিতি যে এক পরম শক্তির অধীনে আবর্তিত হচ্ছে, মহাকাল ও কালীর এই শাক্ত রূপ তারই শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। অর্থাৎ, মহাকাল ও মহাকালীর তত্ত্ব কেবল দেবদেবীর উপাসনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর গভীরে রয়েছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি ও অস্তিত্বের এক অনন্ত অনুসন্ধান। সময়েরও যিনি অতীত, সেই মহাকাল এবং সৃষ্টির আদিশক্তি কালীর যুগল সত্তা যেন মনে করিয়ে দেয়, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি সৃষ্টি, স্পন্দন ও বিলয়ের নেপথ্যে রয়েছে এক চিরন্তন পরম রহস্য।




