রাত পোহালেই কালীপুজো। ইতিমধ্যে আলোর উৎসবে সেজে উঠতে বাংলা। কিন্ত আপনি কি জানেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে এমন কিছু কালীপুজো, যেগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েকশো বছরের ইতিহাস। কোথাও দেবীর বিসর্জন হয় নাচের ছন্দে, কোথাও আবার প্রতিমা দর্শনে ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ। কলকাতার বাইরে বাংলার এমনই পাঁচটি বিশেষ কালীপুজো রয়েছে, যেগুলি নিজস্ব ঐতিহ্য ও রীতির জন্য বিশেষ পরিচিত।
১. শান্তিপুরের বামাকালী পুজো, নদিয়া
নদিয়ার শান্তিপুরের বামাকালী পুজোর অন্যতম আকর্ষণ দেবীর প্রতিমা এবং বিসর্জনের অভিনব রীতি। সাধারণত দক্ষিণাকালীর মূর্তিতে দেবীর ডান পা শিবের বুকে থাকে। কিন্তু বামাকালীর ক্ষেত্রে দেবীর বাঁ পা থাকে শিবের বুকে। এই বিশেষ রূপের সঙ্গে তান্ত্রিক উপাসনার যোগ রয়েছে। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৯ সালে ঘটের মাধ্যমে এই পুজোর সূচনা হয়। পরের বছর থেকে প্রতিমায় পুজো শুরু হয়। তবে এই পুজোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব বিসর্জন। কাঁধে করে প্রতিমা নিয়ে গঙ্গার দিকে এগিয়ে যান ভক্তরা। ঢাকের বাদ্যি আর জ্বলন্ত মশালের আলোয় ছন্দ মিলিয়ে এগিয়ে চলে প্রতিমা। দেখে মনে হয়, স্বয়ং মা কালী যেন নাচতে নাচতে এগিয়ে চলেছেন।
২. নৈহাটির বড়মা কালীপুজো, উত্তর ২৪ পরগনা
বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় কালীপুজোগুলির মধ্যে রয়েছে নৈহাটির বড়মা পুজো। ১৯২৩ সালে ভাবেশ চক্রবর্তীর হাত ধরে এই পুজোর সূচনা হয়েছিল বলে জানা যায়। নবদ্বীপ থেকে ফিরে তিনি বিশালাকার কালীপ্রতিমা পুজোর উদ্যোগ নেন। সেই থেকেই দেবী পরিচিত হন বড়মা নামে। প্রায় ২২ ফুট উচ্চতার এই প্রতিমা সোনা ও রুপোর অলঙ্কারে সাজানো হয়। পুজোর কয়েক দিন ধরে দূরদূরান্ত থেকে অসংখ্য ভক্তের সমাগম হয়। শুধু প্রতিমা দর্শন নয়, বড়মার বিসর্জনও এই উৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ।
৩. শান্তিপুরের আগমেশ্বরী কালীপুজো, নদিয়া
শান্তিপুরের ঐতিহাসিক কালীপুজোগুলির মধ্যে অন্যতম আগমেশ্বরী পুজো। বৈষ্ণব ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শান্তিপুরে শাক্ত ধর্মের এমন ঐতিহ্যও দীর্ঘদিন ধরে সমানভাবে বজায় রয়েছে। আগমেশ্বরী পুজো সেই ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানেরই এক বিশেষ উদাহরণ।
৪. শান্তিপুরের চাঁদুনি বাড়ির কালীপুজো, নদিয়া
প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো বলে পরিচিত শান্তিপুরের চাঁদুনি বাড়ির কালীপুজো। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সার্বভৌম পরিবারের ইতিহাস। কাশীনাথ সার্বভৌমের নামও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। কথিত আছে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বাল্যশিক্ষার সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল। পারিবারিক বিশ্বাস অনুযায়ী, গোপীনাথ সার্বভৌম স্বপ্নে বিশেষ নির্দেশ পাওয়ার পর এই পুজোর সূচনা করেন। আজও বংশপরম্পরায় এই পুজো হয়ে আসছে। ।
৫. দক্ষিণ দিনাজপুরের বোল্লা রক্ষা কালীপুজো
দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটের কাছে বোল্লা গ্রামে অনুষ্ঠিত হয় বিখ্যাত বোল্লা রক্ষা কালীপুজো। এই পুজোর বিশেষত্ব হল, সাধারণ কালীপুজোর মতো কার্তিক অমাবস্যায় এখানে মূল পুজো হয় না। রাসপূর্ণিমার পরবর্তী শুক্রবার দেবীর আরাধনা করা হয়। দেবী এখানে রক্ষা কালী হিসেবে পূজিত হন। ভক্তদের বিশ্বাস, মা তাঁদের বিপদ-আপদ ও অমঙ্গল থেকে রক্ষা করেন। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, এক জমিদার ব্রিটিশদের হাতে বন্দি হওয়ার পর করসংক্রান্ত বিরোধে মুক্তি পেয়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকেও বহু ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম হয়।




