নিউজ ডেস্ক: মহাকাল নগরী উজ্জয়িনী কেবল দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম ধাম মহাকালেশ্বরের জন্যই বিখ্যাত নয়, বরং এই পুণ্যভূমি জড়িয়ে আছে বহু প্রাচীন, রহস্যময় এবং অলৌকিক সিদ্ধপীঠের সাথেও। এই সমস্ত জাগ্রত তীর্থক্ষেত্রের মধ্যে অন্যতম এবং অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ‘মা গড়কালিকা মন্দির’। পৌরাণিক মান্যতা অনুযায়ী, এই মন্দিরে অবস্থিত মা কালিকার দিব্য বিগ্রহটি স্বয়ং সত্যযুগের এবং এই ঐতিহাসিক মন্দিরটির উৎপত্তি হয়েছিল মহাভারতকালে! যুগে যুগে তন্ত্র সাধক এবং সাধারণ ভক্তদের কাছে এই স্থানটি এক পরম অলৌকিক ধাম হিসেবে পরিচিত।
এই পবিত্র ধামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং বিস্ময়কর এক পৌরাণিক ইতিহাস। ত্রেতাযুগের এক কাহিনি অনুসারে, লঙ্কা জয়ের পর সীতা উদ্ধার করে যখন ভগবান শ্রী রামচন্দ্র ও পবনপুত্র হনুমানজী অযোধ্যায় ফিরছিলেন, তখন তাঁরা উজ্জয়িনীর রুদ্রসাগর তীরে কিছু সময় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সেই রাতে মা কালিকা সেখানে উপস্থিত হন এবং পরিহাসচ্ছলে হনুমানজীকে ধরার চেষ্টা করেন। কিন্তু রুদ্রাবতার বজরংবলী মুহূর্তের মধ্যে এক ছোট বাছুরের রূপ ধারণ করে দেবীকে চমকে দেন। দেবী যখন সেখান থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর দেহাংশের একটি অংশ খসে পড়েছিল এই পুণ্যভূমিতে। পরবর্তীতে এই স্থানটিই ‘গড়কালিকা সিদ্ধপীঠ’ নামে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।
পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি বর্তমান সময়েও এই মন্দিরে একটি পরম বিস্ময়কর ও বৈপ্লবিক দৃশ্য চোখে পড়ে। ভারতের বেশিরভাগ প্রাচীন ও সনাতন ধর্মাবলম্বী মন্দিরে যেখানে কেবল পুরুষ পূজারীদেরই আধিপত্য বা প্রাধান্য দেখা যায়, সেখানে গড়কালিকা মন্দিরে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র বিদ্যমান। এখানে মায়ের নিত্যপুজো, ভোগ এবং আরতি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পরিচালনা করেন একজন মহিলা পূজারী—মহন্ত কারিশমা নাথ জি। সনাতন ধর্মে নারী শক্তির এই সর্বোচ্চ সম্মান ও অনন্য ভূমিকা আধুনিক সমাজেও এক যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা মন্দিরটিকে অন্য সব তীর্থক্ষেত্র থেকে আলাদা করে তুলেছে।
এই ধামের অলৌকিক মহিমা ও সিদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রমাণ জড়িয়ে আছে ভারতের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মহাকবি কালীদাসের সাথে। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, শুরুর জীবনে কালীদাস অত্যন্ত মূর্খ ছিলেন। শাস্ত্রজ্ঞ স্ত্রীর কাছে চরম অপমানিত ও তিরস্কৃত হয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং গৃহত্যাগ করে এই মন্দিরে এসে মা কালিকার চরণে আশ্রয় নেন। মায়ের চরণে প্রাণ ঢেলে প্রার্থনা করার পর, দেবী কালিকার অলৌকিক কৃপাদৃষ্টি ও আশীর্বাদে সেই মহামূর্খ মানুষটি মুহূর্তের মধ্যে পরম জ্ঞানী ও অসামান্য প্রতিভাধর ‘মহাকবি কালীদাসে’ পরিণত হন। তাঁর মুখ থেকে নিঃসৃত হতে শুরু করে একের পর এক অমর কাব্য।
মহাভারতের যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, গড়কালিকা সিদ্ধপীঠ কোটি কোটি ভক্তিপ্রাণ মানুষ এবং তন্ত্র সাধকদের কাছে এক পরম বিশ্বাসের স্থান। উজ্জয়িনীতে আসা প্রতিটা ভক্তই বিশ্বাস করেন, মহাকালের দর্শনের পর মা গড়কালিকার চরণে মাথা না নোয়ালে উজ্জয়িনী যাত্রা যেন অধরাই থেকে যায়।




