নিউজ ডেস্ক: প্রথমে নাকে এসেছিল দুর্গন্ধ। তার পর একে একে সামনে আসে এক পরিবারের তিন সদস্যের মৃত্যুর মর্মান্তিক কাহিনি। মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার বিরারের গ্লোবাল সিটির গার্ডেন অ্যাভিনিউ আবাসনের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয় দুই ভাই ও এক বোনের পচন ধরা দেহ। মৃতেরা দীপেশ মেহতা (৫২), কুমার মেহতা (৫০) এবং খেভনা মেহতা (৪৮)। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পারা এবং চরম আর্থিক সংকটের জেরেই তাঁরা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে একটি ভিডিয়োও রেকর্ড করেছিলেন তাঁরা। সেখানে নিজেদের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। কিন্তু এই ঘটনার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, এতটা বিপর্যয়ের মধ্যে থেকেও কেন কারও কাছে পৌঁছতে পারলেন না তাঁরা?
বিরারের গার্ডেন অ্যাভিনিউ আবাসনের ডি উইংয়ের ১২ তলার একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে থাকতেন তিন ভাইবোন। ২০২৫ সাল থেকে তাঁরা সেখানে বসবাস করছিলেন। প্রতিবেশীদের নজরে প্রথম আসে ফ্ল্যাটের বাইরে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ। আবাসনের বাসিন্দারা প্রথমে বিষয়টিকে স্বাভাবিক ভেবেছিলেন। কিন্তু দুর্গন্ধ ক্রমশ বাড়তে থাকায় সন্দেহ তৈরি হয়। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। বলিঞ্জ থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকে। তখনই তিনটি দেহ উদ্ধার হয়। দেহগুলি বেশ কয়েক দিন ধরে ঘরের মধ্যে পড়ে থাকায় পচন ধরেছিল। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, মৃত্যুর তিন-চার দিন পর তাঁদের দেহ উদ্ধার করা হয়।
তদন্তে উঠে এসেছে, তিন ভাইবোনের মধ্যে দু’জন গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। এক ভাই পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। অন্য ভাই ক্যানসারের চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। চিকিৎসার ব্যয়, দৈনন্দিন খরচ এবং বাড়িভাড়া—সব মিলিয়ে তাঁদের আর্থিক পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হয়ে পড়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগও সীমিত হয়ে এসেছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে আত্মীয়দের কাছেও আর্থিক সাহায্য চেয়েছিলেন তাঁরা।
মৃতদের এক বিবাহিত বোনের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পারে, কয়েক দিন আগে তাঁর কাছে টাকা চেয়েছিলেন ভাইয়েরা। দৈনন্দিন খরচ, বাড়িভাড়া এবং চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর জন্য তাঁদের অর্থের প্রয়োজন ছিল। ওই বোনের নিজেরও আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকায় চাহিদামতো সাহায্য করা সম্ভব হয়নি। তিনি কিছু টাকা দিয়েছিলেন এবং অন্য কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলে জানা যাচ্ছে।
মৃত্যুর আগে তিন ভাইবোন একটি ভিডিয়ো রেকর্ড করেছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। গুজরাতি ভাষায় রেকর্ড করা ওই ভিডিয়োয় তাঁরা নিজেদের অসুস্থতা, চিকিৎসার খরচ এবং আর্থিক দুরবস্থার কথা তুলে ধরেছিলেন বলে তদন্তকারীদের দাবি। তাঁদের এই সিদ্ধান্তের জন্য অন্য কাউকে দায়ী করেননি বলেও প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে। তবে ভিডিয়োটির সত্যতা, বক্তব্যের সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং মৃত্যুর সঙ্গে তার সম্পর্ক খতিয়ে দেখছে পুলিশ। মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ফরেনসিক নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের তরফে আপাতত দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর রিপোর্ট বা এডিআর নথিভুক্ত করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছেন তদন্তকারীরা। বিষক্রিয়ার আশঙ্কা করা হলেও তা চূড়ান্ত ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা রয়েছে।
এই ঘটনায় আরও একটি বিষয় সামনে এসেছে। যে আবাসনে তিন ভাইবোনের মৃত্যু হয়েছে, সেখানে অতীতেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ফলে আবাসনের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেশীদের বক্তব্য, দুই ভাইকে মাঝেমধ্যে একসঙ্গে হাসপাতালে যেতে দেখা যেত। অন্য ভাই অসুস্থতার কারণে বেশির ভাগ সময় বাড়িতেই থাকতেন। কিন্তু তাঁদের আর্থিক ও মানসিক সংকট যে এতটা গভীর হয়ে উঠেছিল, তা অনেকেরই জানা ছিল না।
এই মর্মান্তিক ঘটনা ফের সামনে আনল গুরুতর অসুস্থতা, চিকিৎসার বিপুল খরচ এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা মানুষের অসহায়তার ছবি। বিশেষত, একই পরিবারের একাধিক সদস্য অসুস্থ হলে চিকিৎসা ও পরিচর্যার দায়িত্ব সামলানো কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, তা এই ঘটনা বুঝিয়ে দিল। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিংবা সাহায্য চেয়েও পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়া সেই সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
তবে এই মৃত্যুকে শুধু আর্থিক দুরবস্থার ঘটনা হিসেবে দেখলে বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নগুলি আড়ালে থেকে যাবে। অসুস্থ ও আর্থিক ভাবে বিপর্যস্ত মানুষদের কাছে চিকিৎসা, সামাজিক সহায়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা কতটা সহজে পৌঁছচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সংকটের সময়ে সাহায্য চাওয়ার সুযোগ এবং সেই সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, বিরারের তিন ভাইবোনের মৃত্যু সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে আনল।




