নিউজ ডেস্ক: পাহাড় মানেই কি উটি, দার্জিলিং কিংবা সিমলা? পর্যটকদের পরিচিত গন্তব্যের বাইরে এমন কিছু পাহাড়ি শহর রয়েছে, যাদের সৌন্দর্য এখনও অনেকটাই আড়ালে। তেমনই একটি জায়গা তামিলনাড়ুর নীলগিরি জেলার কোটাগিরি। চায়ের বাগান, মেঘে ঢাকা পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর ঝরনার মায়াবী পরিবেশে ঘেরা এই ছোট্ট পাহাড়ি শহরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বলিউডের অন্যতম আলোচিত অভিনেত্রী সাই পল্লবীর পারিবারিক শিকড়। নীতেশ তিওয়ারির ‘রামায়ণ’-এ সীতার চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন তিনি। আর সেই সূত্রেই পর্যটকদের নজর কাড়ছে তাঁর পূর্বপুরুষের শহর কোটাগিরি।
সাই পল্লবীর শিকড় যেখানে
দক্ষিণী সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সাই পল্লবীর পারিবারিক শিকড় রয়েছে তামিলনাড়ুর নীলগিরি পাহাড়ের কোটাগিরিতে। তিনি আদিবাসী বাদাগা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। নীলগিরি অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন জনগোষ্ঠী এই বাদাগারা। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং জীবনযাত্রা রয়েছে।
ফলে কোটাগিরির সঙ্গে অভিনেত্রীর সম্পর্ক শুধু একটি ভৌগোলিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও।
উটির মতো সৌন্দর্য, অথচ অনেক বেশি নিরিবিলি
নীলগিরি বেড়াতে গেলে অধিকাংশ পর্যটকের প্রথম পছন্দ উটি। কেউ যান কুনুরে। কিন্তু এই দুই পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রের তুলনায় কোটাগিরিতে পর্যটকদের ভিড় অনেকটাই কম। অথচ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনও খামতি নেই। পাহাড়ের ঢালে সারি সারি চায়ের বাগান, সবুজ উপত্যকা, চিরহরিৎ বনাঞ্চল এবং মেঘের আনাগোনায় কোটাগিরির পরিবেশ অন্য মাত্রা পায়।
যাঁরা ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি কয়েকটা দিন কাটাতে চান, তাঁদের জন্য জায়গাটি বিশেষ আকর্ষণীয়। শুধু পাহাড় দেখা নয়, চা-বাগানের মধ্যে হাঁটা, স্থানীয় চা কারখানা ঘুরে দেখা এবং চা তৈরির প্রক্রিয়া জানার সুযোগও রয়েছে এখানে। কোথাও কোথাও চায়ের স্বাদ নেওয়া এবং পছন্দের চা কিনে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
কোথায় কোথায় ঘুরবেন?
কোটাগিরি বেড়াতে গেলে অন্যতম আকর্ষণ কোডানাড ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে নীলগিরি বায়োস্ফিয়ার এবং ময়র নদীর উপত্যকার বিস্তৃত দৃশ্য চোখে পড়ে। প্রায় ২২০ ডিগ্রি জুড়ে পাহাড়, উপত্যকা এবং সবুজের যে বিস্তার, তা প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। পরিষ্কার আবহাওয়ায় দূরের পাহাড়ের সারিও দেখা যায়।
এর পর যেতে পারেন ক্যাথরিন জলপ্রপাত। আরাভেনু এলাকার কাছে অবস্থিত এই জলপ্রপাতের বিশেষত্ব তার দ্বিস্তরীয় জলধারা। পাহাড়ের গা বেয়ে নীচে নেমে আসা জলের দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বর্ষার পরে জলপ্রপাতের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।
যাঁরা জঙ্গলের পরিবেশ ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য রয়েছে লংউড শোলা বন। নীলগিরির এই চিরহরিৎ পাহাড়ি বনাঞ্চল জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত। পাখি দেখা, প্রকৃতির মধ্যে হাঁটা কিংবা নিরিবিলিতে সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি আদর্শ।
এ ছাড়াও রয়েছে রঙ্গস্বামী শৃঙ্গ ও পিলার। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাকৃতিক শিলাস্তম্ভ এবং আশপাশের ট্রেকিংয়ের পথ অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের আকর্ষণ করে।
ইতিহাসের পাতাতেও কোটাগিরি
কোটাগিরির পরিচয় শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঔপনিবেশিক ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে এই পাহাড়ি শহর। ১৮১৯ সালে ব্রিটিশ প্রশাসক জন সুলিভান এই অঞ্চলে এসেছিলেন। পরবর্তী সময়ে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ব্রিটিশ আধিকারিকদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশযাপনের অন্যতম জায়গা হয়ে ওঠে কোটাগিরি।
শহরের নামের মধ্যেও রয়েছে স্থানীয় ইতিহাসের ছাপ। 'কোটাগিরি' শব্দের অর্থ 'কোটাদের পাহাড়'। নীলগিরির আদিবাসী কোটা সম্প্রদায়ের নাম থেকেই এই নামের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। অন্যদিকে বাদাগা সম্প্রদায়েরও গুরুত্বপূর্ণ বসতি রয়েছে এই অঞ্চলে।
কখন যাবেন, কীভাবে ঘুরবেন?
কোটাগিরি ঘোরার জন্য সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কে সাধারণত ভালো বলে মনে করা হয়। এই সময়ে আবহাওয়া তুলনামূলক মনোরম থাকে। তবে বর্ষার পরে পাহাড়ের সবুজ রূপ এবং জলপ্রপাতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন পর্যটকেরা। বৃষ্টির সময়ে পাহাড়ি রাস্তা ও জঙ্গলের পথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
উটি ও কুনুরের সঙ্গে একই সফরে কোটাগিরি ঘুরে নেওয়া যায়। চা-বাগান, পাহাড়ি উপত্যকা এবং বনাঞ্চল দেখতে হাতে অন্তত দু'তিন দিন রাখলে ভালো। ট্রেকিংয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় গাইডের সাহায্য নেওয়া এবং বনাঞ্চলের প্রবেশ সংক্রান্ত নিয়ম মেনে চলা জরুরি।
সব মিলিয়ে, নীলগিরির পরিচিত পর্যটন মানচিত্রের বাইরে কোটাগিরি এমন এক গন্তব্য, যেখানে পাহাড়ের সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে রয়েছে আদিবাসী সংস্কৃতি ও ঔপনিবেশিক ইতিহাস। সাই পল্লবীর পারিবারিক শিকড়ের সূত্রে জায়গাটি নতুন করে আলোচনায় এলেও প্রকৃতির নির্জনতা আর পাহাড়ি জীবনের স্বাদ নিতে চাইলে এই ছোট্ট শহর নিজস্ব আকর্ষণেই পর্যটকদের টানতে পারে।




