বারাণসী: এক দিকে প্রাচীন মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, অন্য দিকে গঙ্গার বুকে ভেসে থাকা অসংখ্য প্রদীপের আলো। ঘাটের প্রতিটি সিঁড়ি সেজে উঠেছে মাটির প্রদীপে। কোথাও শঙ্খধ্বনি, কোথাও বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, আবার কোথাও আরতির আগুনে আলোকিত গঙ্গার জল। দীপাবলির রেশ কাটতে না কাটতেই আরও এক আলোর উৎসবে মেতে ওঠে বারাণসী। নাম দেব দীপাবলি। হিন্দু বিশ্বাসে এই দিন দেবতারা স্বর্গ থেকে নেমে আসেন মর্ত্যে, পবিত্র গঙ্গায় স্নান করতে। তাঁদের স্বাগত জানাতেই প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে তোলা হয় কাশীর সমস্ত ঘাট। পর্যটকদের কাছে এই উৎসব এখন ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অভিজ্ঞতা।
কেন পালিত হয় দেব দীপাবলি?
কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় দেব দীপাবলি। সাধারণত দীপাবলির ১৫ দিন পরে এই উৎসব আসে। ২০২৬ সালে ২৪ নভেম্বর, মঙ্গলবার পালিত হবে এই উৎসব। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এই দিনেই ভগবান শিব ত্রিপুরাসুর নামে এক অসুরকে বধ করেছিলেন। সেই বিজয়কে স্মরণ করেই দিনটি ত্রিপুরারি পূর্ণিমা নামেও পরিচিত।
পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, ত্রিপুরাসুর তিনটি দুর্গের অধিকারী ছিল। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন দেবতারা। শেষ পর্যন্ত মহাদেব সেই তিনটি দুর্গ ধ্বংস করে অসুরকে বধ করেন। অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির এই বিজয়কে স্মরণ করেই দেব দীপাবলির সূচনা বলে মনে করা হয়। লোকবিশ্বাস, এই বিশেষ পূর্ণিমার রাতে দেবতারা কাশীতে এসে গঙ্গায় স্নান করেন। তাঁদের আগমন উপলক্ষে মর্ত্যের মানুষও প্রদীপ জ্বালিয়ে উৎসবে শামিল হন।
আলোর চাদরে ঢেকে যায় ৮৪টি ঘাট
দেব দীপাবলির প্রধান আকর্ষণ বারাণসীর গঙ্গার ঘাটগুলি। গঙ্গার দুই পাড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘাট। উৎসবের সন্ধ্যায় সেই ঘাটগুলির সিঁড়িতে সারি সারি মাটির প্রদীপ জ্বালানো হয়। দশাশ্বমেধ ঘাট, অসি ঘাট, রাজেন্দ্রপ্রসাদ ঘাট থেকে রাজঘাট—সর্বত্রই দেখা যায় আলোর বর্ণময় আয়োজন।
প্রদীপের আলো যখন গঙ্গার জলে প্রতিফলিত হয়, তখন গোটা নদী যেন আলোর এক বিশাল আয়নায় পরিণত হয়। দূর থেকে মনে হয়, আকাশের অসংখ্য তারা নেমে এসেছে নদীর বুকে। শুধু ঘাট নয়, প্রাচীন মন্দির, অলিগলি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলিও সাজিয়ে তোলা হয় আলোয়।
এই উৎসবের ব্যাপকতা এতটাই যে, প্রতি বছর দেশ-বিদেশের বিপুল সংখ্যক পর্যটক কাশীতে ভিড় করেন। কারও কাছে এটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রা, কারও কাছে ভারতের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার বিরল সুযোগ।
গঙ্গা আরতি, নৌকাবিহারেই উৎসবের আসল আকর্ষণ
দেব দীপাবলির সন্ধ্যায় গঙ্গা আরতি এক অন্য মাত্রা পায়। দশাশ্বমেধ ঘাটে পুরোহিতদের সমবেত আরতি, ধূপের ধোঁয়া, প্রদীপের শিখা এবং মন্ত্রোচ্চারণ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপূর্ব পরিবেশ। সাধারণ দিনের গঙ্গা আরতির তুলনায় এই দিনের আয়োজন অনেক বেশি জাঁকজমকপূর্ণ।
তবে পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতাগুলির অন্যতম গঙ্গায় নৌকাবিহার। নদীর মাঝখান থেকে একসঙ্গে বহু ঘাটের আলোকসজ্জা দেখার সুযোগ মেলে। এক দিকে প্রাচীন মন্দিরের সারি, অন্য দিকে গঙ্গার জলে প্রতিফলিত লক্ষ লক্ষ প্রদীপ। স্থলভাগ থেকে যে দৃশ্যের সম্পূর্ণ ব্যাপ্তি বোঝা কঠিন, নৌকায় বসে তা অনেক সহজে উপভোগ করা যায়।
এ ছাড়াও বিভিন্ন ঘাটে শাস্ত্রীয় সংগীত, নৃত্য, লোকসংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ফলে দেব দীপাবলি শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসবে সীমাবদ্ধ থাকে না। কাশীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক বড় প্রদর্শনী হয়ে ওঠে।
কেন এই সময়েই বারাণসী ভ্রমণ সেরা?
বারাণসী এমনিতেই ভারতের অন্যতম প্রাচীন শহর। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই শহরের বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, কাশীতে মৃত্যু হলে মোক্ষলাভ সম্ভব। কাশী বিশ্বনাথ মন্দির, গঙ্গার ঘাট, সরু অলিগলি এবং সন্ধ্যার আরতি—সব মিলিয়ে সারা বছরই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে এই শহর।
তবে দেব দীপাবলির সময় শহরের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যায়। সাধারণ দিনে যে ঘাটগুলি ধর্মীয় আচার ও পর্যটনের কেন্দ্র, উৎসবের রাতে সেগুলিই পরিণত হয় বিশাল আলোকমঞ্চে। ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ফটোগ্রাফি, ইতিহাস, স্থাপত্য এবং সংস্কৃতিতে আগ্রহীদের কাছেও এই সময় বারাণসী বিশেষ আকর্ষণীয়।
বিশেষ করে যাঁরা প্রথম বার কাশী যাচ্ছেন, তাঁদের কাছে দেব দীপাবলি একসঙ্গে একাধিক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেয়। কাশী বিশ্বনাথ মন্দির দর্শন, গঙ্গা আরতি, নৌকাবিহার এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ—সবই মিলতে পারে একই সফরে।
ভিড় সামলাতে আগাম পরিকল্পনা জরুরি
তবে এই উৎসবের জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে ভিড়ও। দেব দীপাবলির কয়েক দিন আগে থেকেই বারাণসীর হোটেল ও অতিথিশালাগুলিতে বুকিংয়ের চাপ বাড়তে থাকে। ফলে শেষ মুহূর্তে থাকার জায়গা পাওয়া কঠিন হতে পারে। নৌকাবিহারের ক্ষেত্রেও আগাম বুকিং করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
উৎসবের দিন বিকেলের পর ঘাট সংলগ্ন এলাকায় যান চলাচলে বিধিনিষেধ থাকতে পারে। তাই সূর্যাস্তের অনেক আগেই নির্দিষ্ট ঘাটে পৌঁছে যাওয়া ভাল। ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হতে পারে বলে আরামদায়ক জুতো পরা এবং প্রয়োজনীয় পানীয় জল সঙ্গে রাখা জরুরি। নৌকায় ওঠার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেব দীপাবলির বিশেষত্ব এখানেই—এটি শুধু প্রদীপ জ্বালানোর উৎসব নয়, বরং কয়েক হাজার বছরের ধর্মীয় বিশ্বাস, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের সম্মিলিত আবেগের এক অনন্য প্রকাশ। গঙ্গার বুকে যখন প্রদীপের আলো কাঁপতে থাকে, তখন কাশী যেন তার প্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন করে বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। তাই ভারতের অন্যতম স্মরণীয় ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চাইলে কার্তিক পূর্ণিমার বারাণসী নিঃসন্দেহে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় থাকতে পারে।




