নিজস্ব প্রতিবেদন, সিঙ্গুর: হুগলি জেলার সিঙ্গুরের পুরুষোত্তমপুর গ্রাম। আপাতশান্ত এই গ্রামের বুকেই লুকিয়ে রয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের পুরনো এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস। এখানকার এক প্রাচীন কালীমন্দিরকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রয়েছে এমন এক অলৌকিক ও গা ছমছমে কাহিনি, যা শুনলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। স্থানীয় মানুষের কাছে এই দেবী পরিচিত ‘বর-কনে খাওয়া কালী’ নামে। জনশ্রুতি রয়েছে, বহু বছর আগে এক বিয়ের রাতে খোদ দেবী নাকি জীবন্ত গিলে খেয়েছিলেন এক নবদম্পতিকে!
কার্তিক মাসের অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে যখন চারদিক ঢেকে যায়, তখন এই মন্দিরে মায়ের আরাধনাকে কেন্দ্র করে ভক্তদের ঢল নামে। তবে শুধু দীপান্বিতা কালীপুজোই নয়, বছরের অন্যান্য সাধারণ দিনেও এই মন্দিরের রহস্য আর লোকগাথা টেনে আনে দূর-দূরান্তের মানুষকে।
মন্দিরের ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ৫৫০ বছর আগে এই অঞ্চলটি ছিল গভীর জঙ্গলে ঘেরা। আর সেই জঙ্গল ছিল কুখ্যাত ডাকাতদের স্বর্গরাজ্য। তখন এই এলাকায় দাপিয়ে বেড়াত ডাকাত সর্দার রঘুনাথ। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে এই জাগ্রত কালীমূর্তির সামনে নরবলি দিত রঘুনাথ ও তার দলবল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নরবলি বন্ধ হলেও, দেবীর সেই উগ্র রূপ এবং ডাকাতদের স্মৃতি আজও জড়িয়ে রয়েছে এই মন্দিরের দেওয়ালে দেওয়ালে।
মন্দিরের নাম ‘বর-কনে খাওয়া কালী’ হওয়ার পিছনে যে গা ছমছমে লোকশ্রুতি রয়েছে, তা পুরুষানুক্রমে চলে আসছে এই গ্রামের মানুষের মুখে মুখে। লোকগাথা অনুযায়ী, একবার ডাকাত সর্দার রঘুনাথের ছেলের বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর গভীর রাতে নতুন বর ও কনেকে পালকিতে নিয়ে ফিরছিলেন বরযাত্রীরা। ফেরার পথে হঠাৎই আকাশ কালো করে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হয়। ঝড়ের হাত থেকে বাঁচতে পালকির বেহারারা এবং বরযাত্রীর দল পুরুষোত্তমপুরের এই প্রাচীন কালীমন্দিরের চাতালে এসে আশ্রয় নেন। ঝড়-বৃষ্টির তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, সুরক্ষার খাতিরে নবদম্পতিকে মন্দিরের গর্ভগৃহের ভিতরে বসিয়ে দেওয়া হয়। আর বাকিরা সবাই মন্দিরের বাইরে এবং কাছের একটি বড় গাছের তলায় আশ্রয় নেন।
কিছুক্ষণ পর ঝড়ের তাণ্ডব থামলে বরযাত্রীরা বর-কনেকে পালকিতে তুলতে মন্দিরের ভিতরে যান। কিন্তু গর্ভগৃহে পা রাখতেই সবার চোখ চড়কগাছ হয়ে যায়! দেখা যায়, মন্দিরের ভিতর সম্পূর্ণ ফাঁকা। সেখানে নতুন বর বা কনে—কারও কোনও চিহ্নই নেই। চারদিকে হইচই পড়ে যায়। আশপাশের জঙ্গলে শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। কিন্তু কোথাও তাঁদের পাওয়া যায়নি।
ঠিক সেই সময় মন্দিরের ভিতরে প্রদীপের আলোয় দেবীর মূর্তির দিকে তাকাতেই স্তম্ভিত হয়ে যান ডাকাত সর্দার-সহ উপস্থিত সকলে। দেখা যায়, পাথরের তৈরি দেবী কালীর মুখ থেকে ঝুলছে একটি চাবির গোছা। আর সেই চাবির গোছাটি আর কারও নয়, সেটি ছিল নববধূর শাড়ির আঁচলে বাঁধা!
এই ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে, দেবী নিজেই অলৌকিক উপায়ে ওই নবদম্পতিকে নিজের গর্ভে ধারণ করেছেন বা ‘গিলে’ নিয়েছেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই মন্দির ‘বর-কনে খাওয়া কালী’ মন্দির নামেই খ্যাত। আজকের বিজ্ঞানমনস্ক যুগে দাঁড়িয়ে এই ঘটনাকে নিছকই জনশ্রুতি বা গল্প বলে মনে হতে পারে। অনেকের ধারণা, হয়তো ঝড়ের অন্ধকারে কোনও বন্যজন্তুর আক্রমণ বা অন্য কোনও বিপদ ঘটেছিল, যা কালক্রমে অলৌকিক রূপ নিয়েছে। তবে যুক্তি যাই হোক না কেন, ভক্তি আর বিশ্বাসের টানে আজও মানুষ ছুটে আসেন সিঙ্গুরের এই জাগ্রত দেবীর দরবারে। বিশেষ করে নতুন বিয়ের পর কোনও দম্পতি এই রাস্তা দিয়ে গেলে, আজও তাঁরা মায়ের আশীর্বাদ না নিয়ে পথ অতিক্রম করেন না।




