বিশেষ প্রতিবেদন: মানুষের সঙ্গে গাঁজার সম্পর্ক কত দিনের? এত দিন প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা ছিল, প্রাচীন সভ্যতায় নেশার উপাদান হিসেবে গাঁজার ব্যবহার শুরু হয়েছিল আনুমানিক ২৫০০ বছর আগে। কিন্তু সাইবেরিয়ায় এক রাজকীয় সমাধির ভিতর থেকে পাওয়া নতুন প্রমাণ সেই ধারণাকেই বদলে দিল। গবেষকদের দাবি, প্রায় ২৮০০ বছর আগেও গাঁজার নেশা করত মানুষ। অর্থাৎ, আগে যতটা অনুমান করা হয়েছিল, তার অন্তত ৩০০ বছর আগে থেকেই গাঁজার মনঃপ্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদান ব্যবহার করত কোনও কোনও মানবগোষ্ঠী। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকা 'সায়েন্স'-এ।
দক্ষিণ সাইবেরিয়ার তুভা প্রজাতন্ত্রের উয়ুক উপত্যকায় অবস্থিত 'তুননুগ ১' (Tunnug 1) নামের একটি প্রাচীন সমাধিক্ষেত্র ঘিরে এই গবেষণা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, সমাধিটি স্কিথীয় (Scythian) জনগোষ্ঠীর উচ্চপদস্থ কোনও ব্যক্তি বা রাজপরিবারের সদস্যদের। ইউরেশীয় তৃণভূমি অঞ্চলে একসময় ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে বেড়াত এই যাযাবর জনগোষ্ঠী। যুদ্ধবিদ্যা, ঘোড়সওয়ারি এবং নিজস্ব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য পরিচিত ছিল তারা।
২০১৭ সাল থেকে এই সমাধিক্ষেত্রে খননকাজ চালাচ্ছেন গবেষকরা। সেখানে সোনা ও মূল্যবান অলঙ্কার, পশুর মূর্তি, ছোরা, মানুষের দেহাবশেষের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ গাঁজার বীজ পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০০টি বীজ উদ্ধার হয়েছে। প্রথমে এই বীজগুলিকে সমাধি-সংক্রান্ত কোনও ধর্মীয় আচারের উপকরণ বলেই মনে করেছিলেন গবেষকরা। কিন্তু পরবর্তী পরীক্ষায় সামনে আসে আরও চমকপ্রদ তথ্য।
সমাধিক্ষেত্র থেকে উদ্ধার হওয়া মানুষের চুলের নমুনা পরীক্ষা করেন বিজ্ঞানীরা। অত্যাধুনিক রাসায়নিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই চুলে পাওয়া যায় গাঁজার মনঃপ্রভাব সৃষ্টিকারী উপাদান টিএইচসি (THC) এবং ক্যানাবিনল (CBN)-এর উপস্থিতির চিহ্ন। টিএইচসি বা ডেল্টা-৯ টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল হল গাঁজার অন্যতম প্রধান সক্রিয় উপাদান, যা মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলে। অন্য দিকে, টিএইচসি অক্সিডেশনের ফলে ক্যানাবিনল তৈরি হতে পারে। ফলে চুলের নমুনায় এই রাসায়নিক উপাদানগুলির উপস্থিতি গবেষকদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
গবেষণার প্রধান লেখক জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ জিওঅ্যানথ্রোপোলজির প্রত্নতাত্ত্বিক জিনো ক্যাসপারির নেতৃত্বে এই অনুসন্ধান চালানো হয়। গবেষকদের মতে, শুধু সমাধিতে গাঁজার বীজ পাওয়া গেলেই যে প্রাচীন মানুষ নেশার জন্য তা ব্যবহার করত, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। কারণ, গাঁজা বহু প্রাচীন কাল থেকেই তেল ও আঁশ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু একই সমাধি থেকে পাওয়া মানুষের চুলে নেশা সৃষ্টিকারী রাসায়নিকের চিহ্ন মেলায় গাঁজার ব্যবহার সম্পর্কে আরও জোরালো প্রমাণ মিলেছে।
তা হলে কী কারণে গাঁজা ব্যবহার করত স্কিথীয়রা? গবেষকদের অনুমান, এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে তাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস। বিশেষ করে শামানবাদী (Shamanism) আচার-অনুষ্ঠানে গাঁজার ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে। শামানবাদী বিশ্বাসে বিশেষ ধর্মীয় ব্যক্তিরা নানা আচার, ধ্যান ও চেতনার পরিবর্তনের মাধ্যমে অতিপ্রাকৃত জগতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতেন। সেই ধরনের অনুষ্ঠানে মনঃপ্রভাব সৃষ্টিকারী উদ্ভিদের ব্যবহার বিভিন্ন প্রাচীন সংস্কৃতিতে দেখা গিয়েছে।
এই সমাধিক্ষেত্রের অন্য আবিষ্কারও সেই সম্ভাবনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
খননকাজে কয়েক ডজন ঘোড়ার বলির চিহ্ন মিলেছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য মানববলিরও ইঙ্গিত পেয়েছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। গবেষকদের একাংশের অনুমান, বলির আগে কোনও কোনও ক্ষেত্রে গাঁজা ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবশ বা শান্ত করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও এই তত্ত্বের পক্ষে এখনও নিশ্চিত প্রমাণ নেই। গবেষণার প্রধান লেখকও জানিয়েছেন, এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তবে তা প্রমাণ করার মতো তথ্য এখনও হাতে আসেনি।
তবে এই আবিষ্কারের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। চুলের নমুনায় রাসায়নিকের উপস্থিতি থেকে গাঁজা ব্যবহারের ইঙ্গিত মিললেও ঠিক কতটা পরিমাণে তা গ্রহণ করা হয়েছিল, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। একই ভাবে গাঁজা ধূমপানের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করেছিল, না কি খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া হয়েছিল, তা-ও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এমনকি উদ্ধার হওয়া গাঁজার গাছগুলিতে টিএইচসি-র মাত্রা কতটা ছিল, সে সম্পর্কেও নির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি।
উল্লেখ্য, পূর্ব এশিয়ায় অন্তত ৬০০০ বছর আগে থেকেই গাঁজার চাষের প্রমাণ রয়েছে। তবে সেই সময় মূলত বীজ থেকে তেল এবং গাছের আঁশ সংগ্রহের জন্যই এর ব্যবহার হত বলে মনে করা হয়। নেশার উপাদান হিসেবে গাঁজার ব্যবহার ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন প্রাচীন প্রত্নস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া পাত্র ও উত্তপ্ত পাথরে পরবর্তী সময়ে ক্যানাবিনয়েডের রাসায়নিক অবশেষও পাওয়া গিয়েছে। যা থেকে প্রাচীনকালে গাঁজা পোড়ানোর মাধ্যমে ব্যবহারের ইঙ্গিত মেলে।
নতুন এই গবেষণা তাই শুধু একটি প্রাচীন সমাধির রহস্য উন্মোচন নয়, মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও সামনে আনছে। বর্তমানে চিকিৎসা, ওষুধশিল্প এবং গাঁজার বৈধ ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে বিতর্ক চলছে, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝতেও এই আবিষ্কার সাহায্য করতে পারে। গবেষকরা এখন উদ্ধার হওয়া উদ্ভিদের নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণ করছেন।
তার মাধ্যমে প্রাচীন গাঁজার প্রজাতি, বিবর্তন এবং মানুষের সঙ্গে এই উদ্ভিদের দীর্ঘ সম্পর্ক সম্পর্কে আরও তথ্য মিলতে পারে বলে আশা তাঁদের। অর্থাৎ, আজকের পৃথিবীতে গাঁজার ব্যবহার নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, মানুষের ইতিহাসে এই উদ্ভিদের উপস্থিতি যে কয়েক হাজার বছরের পুরনো, সাইবেরিয়ার সমাধিক্ষেত্র থেকে পাওয়া নতুন প্রমাণ আরও এক বার সেই কথাই মনে করিয়ে দিল।




