নিজস্ব প্রতিবেদন,কলকাতা: দেবীর নামে রয়েছে নিজস্ব প্যান কার্ড! নিয়ম মেনে জমা পড়ে আয়করও। আবার এই মন্দিরেই একসময় সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে। শুধু তাই নয়, বলি ছাড়াই নিরামিষ ভোগে বছরভর পূজিতা হন এখানকার মা কালী। শুনতে অবাক লাগলেও, উত্তর কলকাতার কাশীপুরে এমনই এক ব্যতিক্রমী মন্দির রয়েছে, যার প্রতিটি পরতে জড়িয়ে রয়েছে বিস্ময়, ইতিহাস এবং নানা অজানা কাহিনি। ৮৭বি কাশীপুর রোডের এই প্রাচীন দেবালয়ই পরিচিত কৃপাময়ী কালীবাড়ি নামে।
উত্তর কলকাতার ৮৭বি কাশীপুর রোডে উদ্যানবাটির সন্নিকটে অবস্থিত এই সুবিশাল দেবালয়টি স্থানীয়ভাবে ‘বামনদাস মুখোপাধ্যায়ের কালীবাড়ি’ নামেই খ্যাত। কনৌজের কবি শ্রীহর্ষের বংশধর এবং সফল কয়লা ব্যবসায়ী বামনদাস মুখোপাধ্যায় ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ অ্যাটর্নি জন হার্ট সাহেবের ৩৫ বিঘার বাগানবাড়িটি কিনে নেন। সেখানেই ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে (১৮২৫ শকাব্দ) তিনি গড়ে তোলেন সিংহদ্বার, বাগান, দিঘি এবং এই নবরত্ন মন্দির। ব্রিটিশ ভারতের মিশ্র কারিগরির অপূর্ব নিদর্শন এই চত্বর। অলিন্দে রয়েছে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামের ঢালাই লোহার স্তম্ভ, বার্মার সেগুন কাঠের কপাট, ইতালি থেকে আনা শ্বেতপাথর এবং খিলানের গায়ে চোখজুড়ানো পঙ্খের অলংকরণ।
স্বপ্নাদেশে বেলুড়ের গঙ্গাতীরে দাঁ পরিবারের বাগান থেকে প্রাপ্ত একটি অখণ্ড কষ্টিপাথর দিয়ে খোদাই করা হয় দেবী কৃপাময়ী এবং তাঁর দুই পার্শ্বস্থ শিবলিঙ্গ। বামনদাসবাবু পিতা ক্ষেত্রমোহনের স্মরণে ‘ক্ষেত্রেশ্বর’ এবং মা দুর্গাময়ীর স্মরণে ‘দুর্গেশ্বর’ শিবের প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের সঙ্গে গর্ভগৃহে পূজিত হন রঘুনাথ শিলা। ভারতীয় বিচারব্যবস্থা ও রাজস্ব আইনের ইতিহাসে এই মন্দিরের স্থান অনন্য। ১৯১৮ সালের স্থায়ী ট্রাস্টের সুবাদে মা কৃপাময়ী এবং দুই শিবলিঙ্গ আইনত স্বতন্ত্র ‘আইনি সত্তা’ (Legal Person)। তাঁদের নামে পৃথক প্যান (PAN) কার্ড রয়েছে এবং নিয়ম মেনে আয়কর দাখিল করা হয়।
অবাক করা হলেও সত্যি যে, এই মন্দিরের দেবী কৃপাময়ীর নিজস্ব নামে একটি প্যান কার্ড রয়েছে। মন্দিরের নামে ও দেবীর নামে বিভিন্ন সম্পত্তি, ট্রাস্ট এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়। আইনগত ও আয়কর সংক্রান্ত কাজের সুবিধার্থে দেবীর নামে প্যান কার্ড করার বিষয়টি বেশ আলোচিত।
১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এই মন্দিরে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। এ ছাড়াও স্বাধীনতা সংগ্রামী বিধানচন্দ্র রায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং মদনমোহন মালব্যের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের যাতায়াত ও স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে কাশীপুরের এই কালীবাড়ির সঙ্গে।
বছরভর মা নিত্যপূজিতা হন। এখানে হয় নিরামিষ ভোগ, নেই বলির প্রথা। দীপান্বিতা অমাবস্যায় মায়ের বিশেষ পুজো হলেও মাঘী পূর্ণিমার দিন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হয় বিশেষ পূজার্চনা। এ ছাড়াও শারদীয় দুর্গাপুজো, বিশ্বকর্মা পুজো ও কার্তিক পুজো সাড়ম্বরে পালিত হয় এই মন্দিরে।




