নিউজ ডেস্ক: কবিতা লেখা, জটিল সমস্যার সমাধান করা কিংবা নতুন নতুন ভাবনা তুলে ধরা—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দক্ষতা দেখে অনেক সময় মনে হতে পারে, সে বুঝি মানুষের মতোই চিন্তা করতে পারে। চ্যাটজিপিটি, ক্লড, গুগল জেমিনি বা পারপ্লেক্সিটির মতো প্রযুক্তি মুহূর্তের মধ্যে নানা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের কার্যপদ্ধতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই তৈরি হয়েছে কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক। কিন্তু গবেষকদের বক্তব্য, এআইয়ের তৈরি উত্তর মানুষের চিন্তার ফলের মতো দেখতে হলেও, দুইয়ের কাজ করার পদ্ধতি এক নয়। অর্থাৎ একই রকম ফলাফল তৈরি করতে পারলেই মানুষের মতো উপলব্ধি বা বোধশক্তি তৈরি হয় না।
কানাডার মন্ট্রিয়ল থেকে প্রকাশিত ‘দ্য কনভারসেশন’-এ এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন দিদিয়ের কামিলো ওলার্তে গনজালেজ এবং পিয়ের-লুক দ্য শঁ। তাঁদের মতে, ‘ওয়ার্ল্ড মডেল’ বা বিশ্ব-পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিতে সক্ষম এআই প্রযুক্তি এই ব্যবধান কিছুটা কমাতে পারে। কোনও পরিস্থিতিতে কী ঘটতে পারে, তা আগে থেকে অনুমান করে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করার ক্ষমতা তৈরি করাই এই প্রযুক্তির লক্ষ্য। তবে তাতেও মানুষের মতো পৃথিবীকে দেখা, শেখা কিংবা বোঝার ক্ষমতা এআইয়ের তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বিষয়টি বোঝাতে একটি কাপের উদাহরণ দিয়েছেন গবেষকেরা। টেবিলের কিনারায় রাখা একটি কাপ তুলতে গেলে মানুষকে প্রথমেই বুঝতে হয়, কতটা দূরত্বে হাত বাড়াতে হবে, কতটা জোরে কাপটি ধরতে হবে। সামান্য ভুল হলেই কাপটি পড়ে ভেঙে যেতে পারে। সাধারণ এই কাজের পিছনেও রয়েছে ভবিষ্যতের ঘটনা অনুমান করার জটিল প্রক্রিয়া। মানুষের মস্তিষ্ক আগে থেকেই সম্ভাব্য পরিস্থিতি কল্পনা করে নেয়। যেমন, বেশি ভরা কাপ দ্রুত তুললে জল পড়ে যেতে পারে, কিংবা বড় সোফা দরজার ফাঁক দিয়ে বেরোবে না—এমন সম্ভাবনাও মানুষ আগেভাগে বুঝতে পারে।
মনোবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব ‘প্রেডিক্টিভ প্রসেসিং’ অনুযায়ী, মানুষের মস্তিষ্ক ক্রমাগত প্রত্যাশা তৈরি করে এবং বাস্তবে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখে। দুইয়ের মধ্যে অমিল হলে সেই অনুযায়ী ধারণা ও কাজের ধরন বদলে নেয়। যেমন, কেউ যদি খালি কাপকে ভুল করে ভর্তি মনে করেন, তা হলে বেশি জোরে সেটি তুলতে পারেন। কিন্তু কাপটি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক হালকা লাগলে মস্তিষ্ক সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরের বার নিজের অনুমান সংশোধন করে।
এআইয়ের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি আলাদা। বৃহৎ ভাষা মডেল বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল মূলত পরবর্তী শব্দ বা শব্দের অংশ অনুমান করতে শেখে। বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা ভাষার নানা ধরন ও সম্পর্ক আয়ত্ত করে। ফলে ‘টেবিলের কিনারায় রাখা কাপে ধাক্কা লাগল’—এই বাক্যের পর কাপটি পড়ে যেতে পারে, এমন উত্তর দিতে পারে চ্যাটবট। কিন্তু কাপটি কেন পড়ল, সেই ঘটনার বাস্তব অভিজ্ঞতা তার নেই। অর্থাৎ সম্ভাব্য পরিণতি বর্ণনা করতে পারা আর তার কারণ উপলব্ধি করা এক বিষয় নয়।
এই ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যেই তৈরি হচ্ছে ‘ওয়ার্ল্ড মডেল’। ভিডিয়ো, সিমুলেশন এবং রোবটের দেখা ও করা কাজের রেকর্ড থেকে এই প্রযুক্তি পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্পর্কে শিখতে পারে। কোনও রোবট কাপ বেশি জোরে ধরলে সেটি ভেঙে যেতে পারে, অথবা ভুল ভাবে হাত বাড়ালে কাপ উল্টে যেতে পারে—এমন সম্ভাবনা আগাম অনুমান করার ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। কাজের অভিজ্ঞতা ও ইন্দ্রিয়ের তথ্যের সঙ্গে পূর্বাভাসকে যুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
তবে গবেষকদের মতে, মানুষের কাছে একটি কাপ শুধু টেবিলের উপরে রাখা একটি বস্তু নয়। সেটি ভঙ্গুর, গরম, নিজের বা অন্যের হতে পারে। সেটি ধরা, সরানো কিংবা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার মতো নানা অভিজ্ঞতা মানুষের জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত। শিশুরাও জীবনের প্রথম কয়েক মাস থেকেই বস্তু কী ভাবে নড়াচড়া করে, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তৈরি করতে শুরু করে। মনোবিজ্ঞানী জঁ পিয়াজের তত্ত্ব অনুযায়ী, শিশুরা পৃথিবীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ মেলামেশা ও কাজের মধ্য দিয়েই জ্ঞান অর্জন করে। অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনও কাজ না করেও তার পরিণতি মনে মনে অনুমান করতে শেখে তারা।
এআইও ওয়ার্ল্ড মডেলের সাহায্যে কাজ ও ইন্দ্রিয়ের তথ্য থেকে শিখতে পারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে ঠিক কী ধরনের জ্ঞান তৈরি হচ্ছে, তা মানুষের শেখার প্রক্রিয়ার সমতুল কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। গবেষকদের বক্তব্য, মানুষের চিন্তার ফলাফল যত নিখুঁত ভাবে নকল করতে পারবে এআই, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তার কাজের ফল এবং চিন্তার প্রক্রিয়ার মধ্যে পার্থক্য বোঝা।




