নিউজ ডেস্ক: বাংলার ইতিহাস আর সংস্কৃতির সঙ্গে মা কালীর আরাধনা বহু শতাব্দী ধরে জড়িয়ে রয়েছে। কলকাতা থেকে বীরভূম, হাওড়া থেকে উত্তর ২৪ পরগনা, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে একাধিক প্রাচীন কালীমন্দির। কোনও মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধক-সন্ন্যাসীদের সাধনার কাহিনি, কোনওটির প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে রাজা-জমিদার কিংবা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের অবদান। এমনই বাংলার সাতটি পরিচিত কালীমন্দিরের ইতিহাস জেনে নেওয়া যাক।
দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দির: কলকাতার অন্যতম জনপ্রিয় এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রানি রাসমণি। ১৮৫৫ সালের ৩১ মে মন্দিরে দেবী ভবতারিণীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। কথিত আছে, কাশী যাত্রার আগে স্বপ্নাদেশ পেয়েই গঙ্গার তীরে মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনজীবনের বহু স্মৃতি।
কালীঘাটের কালীমন্দির: বাংলার অন্যতম প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র কালীঘাট। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ৫১ সতীপীঠের অন্যতম এই স্থানে সতীর ডান পায়ের আঙুল পড়েছিল। আদিগঙ্গার তীরে অবস্থিত এই মন্দিরের বর্তমান কাঠামো উনিশ শতকের গোড়ার দিকে তৈরি হয়। দেবী দক্ষিণাকালীর বিশেষ রূপ এবং মন্দিরের ঐতিহ্য আজও ভক্তদের আকর্ষণ করে।
তারাপীঠের মা তারা: বীরভূমের রামপুরহাটের কাছে অবস্থিত তারাপীঠ শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, বাংলার তন্ত্রসাধনার ইতিহাসেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাধক বামাক্ষ্যাপার নাম। মন্দিরের পাশের মহাশ্মশান তন্ত্রসাধনার জন্য বিশেষ পরিচিত। দেবী তারার কোলে শিবের মূর্তি এই মন্দিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি: উত্তর কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সিদ্ধেশ্বরী কালী। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮০৩ সালে শঙ্কর ঘোষ এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তবে তার আগে থেকেই এই এলাকায় দেবীর আরাধনা প্রচলিত ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আগমনের স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে এই মন্দিরের সঙ্গে।
ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি : কলকাতার বৌবাজার এলাকার এই মন্দিরের নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির নাম। পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে এমনভাবে যুক্ত করেছিলেন যে তিনি বাঙালির লোকসংস্কৃতির পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন। মা কালীর প্রতি তাঁর ভক্তির কাহিনি আজও লোকমুখে প্রচলিত।
বরানগরের কৃপাময়ী কালীবাড়ি: উত্তর ২৪ পরগনার বরানগরে অবস্থিত এই মন্দির বাংলার প্রাচীন কালীমন্দিরগুলির অন্যতম। রানি রাসমণির পরিবারের সঙ্গে এই মন্দিরের ইতিহাসের যোগ রয়েছে। মন্দিরের স্থাপত্য এবং দেবী কৃপাময়ীর আরাধনা বহু বছর ধরে ভক্তদের আকর্ষণ করে আসছে।
হাওড়ার হাজার হাত কালীমন্দির: শিবপুরের ওলাবিবিতলায় অবস্থিত এই মন্দিরের বিশেষত্ব দেবীর হাজার হাতের রূপ। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তান্ত্রিক আশুতোষ মুখোপাধ্যায় স্বপ্নে দেবীকে হাজার হাতের রূপে দর্শন করেছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই মন্দিরে বিশেষ মূর্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দেবীর রুপোর অলংকার ও মুকুটও এই মন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ।
বাংলার এই কালীমন্দিরগুলি শুধুমাত্র পুজো-অর্চনার জায়গা নয়, প্রতিটি মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, স্থাপত্য এবং মানুষের আবেগ। সময় বদলেছে, বদলেছে শহর ও জনপদ, কিন্তু বাংলার মানুষের মনে মা কালীর প্রতি ভক্তি আজও একই রকম অটুট।




