নয়াদিল্লি: শুধু ইতিহাস, ভূগোল কিংবা অর্থনীতির তাত্ত্বিক পাঠ নয়, স্কুলের পড়ুয়াদের এবার শেখানো হবে বাস্তব জীবনে টাকা সামলানোর কৌশলও। কী ভাবে সঞ্চয় করতে হয়, কোথায় বিনিয়োগ করা যায়, মিউচুয়াল ফান্ড কী, ঋণের ইএমআই কী ভাবে কাজ করে, আয়করের হিসাব কী ভাবে করতে হয়—এ বার থেকে নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইতেই মিলবে সেই সব প্রশ্নের উত্তর। পাশাপাশি ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা, লাভ-ক্ষতির হিসাব এবং উদ্যোগপতি হয়ে ওঠার প্রাথমিক পাঠও যুক্ত করেছে ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি)।
নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ের দ্বিতীয় পর্বের অর্থনীতি বিভাগে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা এবং উদ্যোগপতি হওয়ার উপর দু’টি বিশেষ অধ্যায়। নতুন এই সংযোজনের কথা প্রকাশ্যে এনেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অর্থনীতিবিদ সঞ্জীব সান্যাল। তাঁর বক্তব্য, পড়ুয়াদের এমন কিছু জীবনদক্ষতা শেখানোই এই উদ্যোগের লক্ষ্য, যা ভবিষ্যতে দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগবে।
সঞ্চয়, বিনিয়োগ, কর—সবই শেখানো হবে স্কুলে
‘ম্যানেজিং ইওর পার্সোনাল ফিনান্সেস’ বা ‘নিজের ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা পরিচালনা’ শীর্ষক অধ্যায়ে পড়ুয়ারা জানবে কী ভাবে আয়, ব্যয়, সঞ্চয় এবং বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। শুধু বইয়ের তত্ত্ব নয়, বাস্তব জীবনের উদাহরণ দিয়ে বোঝানো হবে আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব।
স্থায়ী আমানত বা ফিক্সড ডিপোজিট, শেয়ার, বন্ড এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মতো বিনিয়োগের মাধ্যমগুলির প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হবে। কোন বিনিয়োগে ঝুঁকি কতটা, সম্ভাব্য লাভের সঙ্গে ঝুঁকির সম্পর্ক কী, সে বিষয়েও আলোচনা থাকবে। পাশাপাশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ইএমআই বা মাসিক কিস্তির ভূমিকা, সুদের হিসাব এবং আর্থিক পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা বোঝানো হবে।
সাধারণ সুদ ও চক্রবৃদ্ধি সুদের মধ্যে পার্থক্যও শেখানো হবে পড়ুয়াদের। মূল্যবৃদ্ধির ফলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কী ভাবে কমে যায়, কেন বাজেট তৈরি করা জরুরি এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটাতে কী ভাবে সঞ্চয় করতে হয়, তা-ও থাকবে পাঠ্যক্রমে। এমনকি পকেটমানি কিংবা উপহার হিসাবে পাওয়া টাকা খরচ করা, সঞ্চয় করা বা ভবিষ্যতের জন্য জমিয়ে রাখার মতো পরিচিত বিষয় দিয়েও আর্থিক ব্যবস্থাপনার পাঠ দেওয়া হবে।
নবম শ্রেণিতেই আয়করের অঙ্ক
নতুন অধ্যায়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সংযোজন আয়কর। নতুন কর ব্যবস্থার বিভিন্ন করের ধাপ বা স্ল্যাব এবং তার ভিত্তিতে করের হিসাব কী ভাবে করতে হয়, তা উদাহরণ-সহ শেখানো হবে। শুধু করের অঙ্ক কষাই নয়, নাগরিকের দায়িত্ব হিসাবেও কর দেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
সময়মতো এবং সঠিক ভাবে কর দেওয়া কেন প্রয়োজন, সেই অর্থ কী ভাবে দেশের উন্নয়ন, জনপরিষেবা এবং সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পে কাজে লাগে, তা-ও ব্যাখ্যা করা হবে। আর্থিক সুরক্ষার ধারণা বোঝাতে আয়ুষ্মান ভারত প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনার মতো স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের উদাহরণও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনার পাশাপাশি রাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং নাগরিকের দায়িত্বের মধ্যে সম্পর্কও বুঝতে পারবে পড়ুয়ারা।
ব্যবসা শুরুর পাঠ, উদাহরণ লিজ্জত পাঁপড়
ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থার পাশাপাশি উদ্যোগপতি হওয়ার প্রাথমিক ধারণাও দেওয়া হবে ‘ফ্রম আইডিয়াজ টু স্টার্টআপস’ বা ‘ভাবনা থেকে স্টার্টআপ’ অধ্যায়ে। কী ভাবে একটি ব্যবসার ধারণা তৈরি হয়, সেই ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে কী ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন, ব্যবসার পরিকল্পনা বা বিজনেস প্ল্যান কী ভাবে তৈরি করতে হয়—সবই থাকবে এই অধ্যায়ে। ব্যবসা শুরু করতে কত টাকা প্রয়োজন, উৎপাদনের খরচ কী ভাবে নির্ধারণ করতে হয়, পণ্যের দাম কী ভাবে ঠিক করা হয়, ক্রেতার চাহিদা বুঝতে হয় কী ভাবে এবং লাভ-ক্ষতির হিসাব কী ভাবে করতে হয়, তা শেখানো হবে। ব্যবসায় ঝুঁকি নেওয়া, নতুন ভাবনা এবং উদ্ভাবনের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়েছে।
এই পাঠ বোঝাতে ভারতীয় ব্যবসার পরিচিত উদাহরণ ব্যবহার করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে লিজ্জত পাঁপড়ের সাফল্যের কাহিনি। ১৯৫৯ সালে মুম্বইয়ে মাত্র সাত জন গৃহবধূ ৮০ টাকা পুঁজি নিয়ে যে উদ্যোগ শুরু করেছিলেন, তা পরবর্তী সময়ে একটি বড় সমবায় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ২০২৩ সালের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যসংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং বার্ষিক ব্যবসার অঙ্ক পৌঁছয় প্রায় ১,৬০০ কোটি টাকায়।
পাশাপাশি হোটেল ব্যবসায়ী মোহন সিং ওবেরয়ের জীবনযাত্রাও তুলে ধরা হয়েছে। মাসে ৫০ টাকা বেতনে হোটেলের ডেস্ক ক্লার্ক হিসাবে কাজ শুরু করে কী ভাবে তিনি দেশের অন্যতম বড় হোটেল গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা হয়ে উঠেছিলেন, সেই কাহিনির মাধ্যমে উদ্যোগ, পরিশ্রম এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনার গুরুত্ব বোঝানো হবে।
ব্যবসা মানেই শুধু মুনাফা নয়, সামাজিক দায়িত্বও
নতুন পাঠ্যবইয়ে ব্যবসার সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকার উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান তৈরি, পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদন, কর প্রদান, নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে উৎসাহ, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা—ব্যবসার এই ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ অবদান আলাদা করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ভারতের স্টার্টআপ ক্ষেত্রের বিকাশ এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার লক্ষ্যও আলোচনায় এসেছে। আত্মনির্ভর ভারতের ভাবনার সঙ্গে উদ্যোগপতি তৈরি এবং নতুন ব্যবসার প্রসারের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। ই-কমার্স, ফিনটেক, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং কৃষি প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রে স্টার্টআপের ভূমিকার কথাও রয়েছে। দেশের ১২০টির বেশি ইউনিকর্ন সংস্থার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বোঝানো হয়েছে, নতুন উদ্যোগ কী ভাবে অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, এই সংযোজন স্কুলশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কারণ, পড়ুয়ারা এত দিন অর্থনীতির নানা তত্ত্ব বইয়ে পড়লেও ব্যক্তিগত জীবনে টাকা পরিচালনা, বিনিয়োগের ঝুঁকি বোঝা কিংবা ব্যবসা শুরু করার প্রাথমিক পরিকল্পনা সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাওয়ার সুযোগ তুলনায় কম ছিল। নতুন অধ্যায়গুলির মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ এবং স্কুলশিক্ষার নতুন পাঠক্রম কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই পাঠ্যবইগুলির পরিবর্তন করছে এনসিইআরটি। সেই ধারাবাহিকতায় নবম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ে ব্যক্তিগত অর্থব্যবস্থা ও উদ্যোগপতির পাঠ যুক্ত হওয়াকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। এখন দেখার, বইয়ের এই নতুন পাঠ শ্রেণিকক্ষে কতটা বাস্তবমুখী ভাবে পড়ানো যায় এবং পড়ুয়ারা সেই শিক্ষা দৈনন্দিন জীবনে কতটা কাজে লাগাতে পারে।




