ওয়াশিংটন: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল শুধু কংগ্রেসের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে আমেরিকার রাজনীতির আগামী দিনের ছবিও। ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে সরিয়ে প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। একাধিক রিপাবলিকান শক্ত ঘাঁটিতে ডেমোক্র্যাটদের জয়, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের পরাজয় এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের সাফল্য—সব মিলিয়ে এই নির্বাচন ঘিরে তৈরি হয়েছে একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ সমীকরণ।
নির্বাচনের ফলাফলকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসনের মাঝপথে তাঁর জনপ্রিয়তা ও নীতির মূল্যায়ন হিসাবেও দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, আইওয়া এবং ওহায়োর মতো রাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য রাজনৈতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই নির্বাচনে পাঁচটি পক্ষ বা ব্যক্তি লাভবান হয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। অন্য দিকে, পাঁচটি পক্ষের জন্য ফলাফল বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে।
যাঁরা লাভবান
১. ডেমোক্র্যাট পার্টি
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লাভ ডেমোক্র্যাটদের। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পাশাপাশি একাধিক রিপাবলিকান-শাসিত রাজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে তারা। টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, আইওয়া এবং ওহায়োর মতো রাজ্যে সাফল্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। লাতিনো ভোটার এবং গ্রামীণ এলাকার ভোটারদের মধ্যেও সমর্থন বাড়াতে পেরেছে দলটি।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতে আসায় এবার গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলির নেতৃত্ব, তদন্তের ক্ষমতা এবং প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার সুযোগ পাবে ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের কর্মসূচি আটকে দেওয়ার ক্ষমতাও বাড়বে। তবে এই সাফল্যকে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে স্থায়ী সমর্থনে পরিণত করাই হবে তাদের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।
২. আবদুল এল-সায়েদ
মিশিগানের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইতিহাস তৈরি করেছেন ৪২ বছর বয়সি চিকিৎসক তথা প্রাক্তন জনস্বাস্থ্য আধিকারিক আবদুল এল-সায়েদ। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে আমেরিকার সেনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা, শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সুরক্ষা এবং ইজরায়েলকে নিঃশর্ত মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতার মতো বিষয়কে সামনে রেখেই প্রচার চালিয়েছিলেন এল-সায়েদ। তাঁর জয় ডেমোক্র্যাট দলের প্রগতিশীল অংশের রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
৩. ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা
এই নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের সাফল্যও উল্লেখযোগ্য। ফ্লোরিডার ২২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী পিয়া দান্ডিয়া। ভার্জিনিয়া থেকে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন সুহাস সুব্রহ্মণ্যম। পাশাপাশি মেরিল্যান্ডের লেফটেন্যান্ট গভর্নর অরুণা মিলারও আরও এক দফার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন।
আমেরিকার নির্বাচনী রাজনীতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের উপস্থিতি যে ক্রমশ বাড়ছে, এই ফলাফল তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি প্রশাসনিক স্তরেও তাঁদের প্রতিনিধিত্ব আরও মজবুত হচ্ছে।
৪. ইরান
মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়কে কূটনৈতিক দিক থেকে ইরানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবার কংগ্রেসে আরও বেশি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। সামরিক খাতে অর্থ বরাদ্দ, যুদ্ধের ব্যয় এবং সংঘাতের পরিধি নিয়ে তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি বাড়তে পারে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই ইরানের উপর মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাত থেকে চলে যাচ্ছে না। বিদেশনীতি ও সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের হাতে এখনও যথেষ্ট নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক ও আর্থিক চাপ বাড়তে পারে।
৫. ভারত
মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলে ভারতের জন্যও নতুন কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য গবেষণা উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তবের মতে, রাজনৈতিক ধাক্কার পর ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের সঙ্গে দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি করতে আগ্রহী হতে পারে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্যের বার্তা দিতে চাইতে পারে হোয়াইট হাউস।
তবে ডেমোক্র্যাটদের জয় মানেই আমেরিকার সংরক্ষণবাদী বাণিজ্যনীতি বদলে যাবে, এমন নয়। বরং ভারতের পক্ষে আরও ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তির দাবি তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে। শুল্কনীতি, রফতানি এবং ভারতীয় পণ্যের মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার—সব ক্ষেত্রেই আগামী দিনে পরিস্থিতির উপর নজর থাকবে নয়াদিল্লির।
যাঁদের জন্য ফলাফল বড় ধাক্কা
৬. ডোনাল্ড ট্রাম্প
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য। নিজের নাম ব্যালটে না থাকলেও ভোটকে কার্যত নিজের শাসনের উপর গণভোটে পরিণত করতে চেয়েছিলেন তিনি। রিপাবলিকান প্রার্থীদের হয়ে প্রচারেও সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাল তাঁর দল।
এবার ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণাধীন কমিটিগুলি প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সরকারি ব্যয় এবং চুক্তি নিয়ে তদন্ত করতে পারবে। আধিকারিকদের তলব করা, নথি চাওয়া এবং প্রশাসনের কাজের ব্যাখ্যা দাবি করার ক্ষমতাও থাকবে তাদের হাতে। কর ও সরকারি ব্যয় সংক্রান্ত ট্রাম্পের একাধিক প্রস্তাবও বাধার মুখে পড়তে পারে।
৭. ইলন মাস্ক
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ধনকুবের ইলন মাস্কও এই নির্বাচনের অন্যতম রাজনৈতিক ক্ষতিগ্রস্ত। রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি তিনি। নির্বাচনের আগে তাঁর রাজনৈতিক সংগঠন আমেরিকা প্যাক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আসনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের হয়ে প্রচার চালিয়েছিল।
টেক্সাসের সেনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনের হয়ে মাস্কের শিবির সক্রিয় ছিল। কিন্তু ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকোর কাছে পরাজিত হন প্যাক্সটন। অন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনেও মাস্ক-সমর্থিত প্রার্থীরা হেরে গিয়েছেন।
এর প্রভাব শুধু রাজনৈতিক অনুদানের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসে সরকারি চুক্তি, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনে মাস্কের আগের ভূমিকা নিয়ে আরও বেশি প্রশ্ন উঠতে পারে।
৮. বিবেক রামাস্বামী
ওহায়োর গভর্নর নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পেয়েও জয় অধরা রইল ভারতীয় বংশোদ্ভূত রিপাবলিকান নেতা বিবেক রামাস্বামীর। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যামি অ্যাকটনের কাছে পরাজিত হয়েছেন তিনি। অ্যাকটন ওহায়োর প্রথম মহিলা গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।
ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ নতুন প্রজন্মের রিপাবলিকান নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন রামাস্বামী। তাঁর নির্বাচনী প্রচারে ম্যাগা-ঘনিষ্ঠ অবস্থান এবং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি গুরুত্ব পেয়েছিল। কিন্তু জাতীয় পরিচিতি ও ট্রাম্পের সমর্থন সত্ত্বেও রাজ্যের ভোটারদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন আদায় করতে পারেননি তিনি। ফলে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
৯. জেডি ভ্যান্স
আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের জন্যও এই ফলাফল অস্বস্তির। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর নাম দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের নীতির পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নিজের রাজ্য ওহায়োতেই রিপাবলিকানদের একাধিক পরাজয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ওহায়োর গভর্নর নির্বাচনে বিবেক রামাস্বামীর হার এবং সেনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান জন হাস্টেডের পরাজয় ভ্যান্সের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্পের সমর্থকদের আস্থা ধরে রাখার পাশাপাশি বৃহত্তর ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোই এখন তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ।
১০. ইজরায়েলপন্থী লবি
আমেরিকার রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে ইজরায়েলপন্থী সংগঠনগুলির প্রভাব রয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট শিবিরের মধ্যেই ইজরায়েলকে নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মিশিগানের আবদুল এল-সায়েদের জয় সেই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ। নির্বাচনী প্রচারে ইজরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করেছিলেন এল-সায়েদ। তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিল ইজরায়েলপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলির সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠী।
বিশেষ করে মিশিগানের ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে আমেরিকান ইজরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটির (এআইপ্যাক) সঙ্গে যুক্ত ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট ৩ কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছিল বলে নির্বাচনী অর্থের হিসাব থেকে জানা গিয়েছে। এল-সায়েদের জয় ডেমোক্র্যাট দলের প্রগতিশীল অংশকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে ইজরায়েল সংক্রান্ত মার্কিন নীতি এবং সামরিক সহায়তা নিয়ে দলের ভিতরে বিতর্ক বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাড়তি ধাক্কা পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের
এই নির্বাচনের ফলাফলে কূটনৈতিক দিক থেকে চাপে পড়তে পারে পাকিস্তানও। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে গত কয়েক মাসে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির। ইরান সংঘাত, বাণিজ্য, খনিজ সম্পদ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়েও ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে ইসলামাবাদ।
কিন্তু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে নতুন করে নজরদারি হতে পারে। শুধু প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগের উপর নির্ভর করে আগের মতো কূটনৈতিক সুবিধা পাওয়া ইসলামাবাদের পক্ষে কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের আসনসংখ্যার লড়াই নয়। এরফলাফল আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, ইরান-নীতি, ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী দু’বছর কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের সংঘাত কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।




