ওয়াশিংটন: মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড়সড় রাজনৈতিক পালাবদল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের পিছনে ফেলে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে চলেছে ডেমোক্র্যাটরা। সেনেটে পাঁচটি আসন দখলের পাশাপাশি হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে তারা। ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রেসিডেন্সির বাকি দু’বছরে তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপর বাড়তে চলেছে কংগ্রেসের নজরদারি। এই ফলাফলকে ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে মার্কিন ভোটারদের স্পষ্ট বার্তা হিসাবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল। তবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ওয়াশিংটনে আটকে থাকবে না। বাণিজ্য, শুল্কনীতি, অভিবাসন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা-সহ একাধিক ক্ষেত্রে তার আঁচ পড়তে পারে ভারতের উপরেও।
কেন এই ফল ট্রাম্পের কাছে বড় ধাক্কা?
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন মূলত প্রেসিডেন্টের মেয়াদের মাঝপথে সরকারের কাজকর্মের মূল্যায়ন। এ বার নির্বাচনে ভোটারদের ক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ, ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি। যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচের উপর চাপ তৈরি হয়েছে। তার দায়ও অনেক ভোটার ট্রাম্প প্রশাসনের উপর চাপিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্পের পক্ষে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা আগের তুলনায় কঠিন হতে পারে। আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় বরাদ্দ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা বাড়বে। প্রয়োজনে প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শুনানির উদ্যোগও নিতে পারবে তারা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রেসিডেন্ট হিসাবে ট্রাম্পের ক্ষমতা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী বিদেশনীতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে এখনও যথেষ্ট ক্ষমতা রয়েছে। কংগ্রেসে পাশ হওয়া কোনও বিলে ভেটো দেওয়ার অধিকারও তাঁর রয়েছে। ফলে আগামী দু’বছরে হোয়াইট হাউস এবং কংগ্রেসের মধ্যে সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা থাকলেও ট্রাম্পের সমস্ত সিদ্ধান্ত এক ধাক্কায় বদলে যাবে না।
ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য চুক্তি কি অনিশ্চয়তায়?
ভারতের কাছে এই নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক বাণিজ্য ও শুল্কনীতি। আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের অন্যতম বড় বাজার। ফলে ওয়াশিংটনের শুল্কনীতি বদলালে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ভারতীয় রফতানিকারকদের উপর। বিশেষ করে বস্ত্র, ওষুধ, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য এবং উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলির উদ্বেগ বাড়তে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও আমেরিকা অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির একটি কাঠামো প্রকাশ করেছিল। সেই কাঠামোয় ভারতীয় পণ্যের উপর ১৮ শতাংশ পারস্পরিক শুল্ক আরোপের কথা জানিয়েছিল ওয়াশিংটন। পরবর্তী সময়ে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিভিন্ন বাণিজ্য সহযোগী দেশের উপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত খারিজ করে দেয়। তার ফলে শুল্কের কাঠামোতেও পরিবর্তন আসে।
এখন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্যনীতি নিয়ে আরও বেশি প্রশ্ন উঠতে পারে। শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত, বাণিজ্য আলোচনার শর্ত এবং ভারত-আমেরিকা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে কংগ্রেসে আলোচনা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ডেমোক্র্যাটদের জয় মানেই ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক অবিলম্বে কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কারণ শুল্কনীতি নির্ধারণে প্রেসিডেন্টের হাতে এখনও বেশ কিছু ক্ষমতা রয়েছে।
H-1B ভিসা নিয়ে স্বস্তি পাবেন ভারতীয় পেশাদারেরা?
আমেরিকায় কর্মরত ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের কাছেও এই নির্বাচনের ফল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে H-1B ভিসা নিয়ে যাঁরা আমেরিকায় কাজ করেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতির কড়াকড়ি এবং বিদেশি দক্ষ কর্মীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আর্থিক শর্ত চাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ রয়েছে।
নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রভাব বাড়লে অভিবাসন নীতি নিয়ে প্রশাসনের উপর নজরদারি বাড়তে পারে। H-1B ভিসা ব্যবস্থার নিয়ম, বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক শর্ত নিয়ে শুনানি বা নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগও দেখা যেতে পারে।
তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই ভিসার নিয়ম রাতারাতি পাল্টে যাবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের জারি করা নির্দেশ বা ঘোষণাও স্বয়ংক্রিয় ভাবে বাতিল হবে না। তার জন্য আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীদের কাছে এই ফল কিছুটা আশার ইঙ্গিত দিলেও এখনই বড়সড় স্বস্তির কথা বলা যাচ্ছে না।
প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় কী প্রভাব?
ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি। গত কয়েক বছরে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। এই সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে মার্কিন কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি প্রতিরক্ষা বরাদ্দ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তির বিষয়গুলি আরও খতিয়ে দেখতে পারে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কমার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ভারত-আমেরিকা কৌশলগত সম্পর্কের পক্ষে দুই দলের মধ্যেই সমর্থন রয়েছে। তাই কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভেঙে পড়বে, এমনটা মনে করছেন না পর্যবেক্ষকেরা।
ট্রাম্পের বিদেশনীতি কি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা?
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হাতে এলেও ডেমোক্র্যাটদের সামনে বেশ কিছু সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাধা থাকবে। বিদেশনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের হাতে উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে। পাশাপাশি কোনও বিল আইনে পরিণত করতে হলে দুই কক্ষের সমর্থনের পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের সম্মতিও প্রয়োজন। ট্রাম্প ভেটো প্রয়োগ করলে সেই সিদ্ধান্ত অতিক্রম করাও সহজ হবে না।
তবে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্য অর্থ বরাদ্দ, তদন্ত, শুনানি এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ট্রাম্পের উপর চাপ তৈরি করতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, সামরিক ব্যয় এবং প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ সংক্রান্ত ক্ষমতার সীমা নিয়ে আগামী দিনে কংগ্রেসে বিতর্ক বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে আমেরিকার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হল। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে থাকলেও কংগ্রেসে বিরোধীদের শক্তি বাড়ায় তাঁর প্রশাসনের সামনে কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। ভারতের জন্যও তাই পরিস্থিতি নজরে রাখার মতো। বাণিজ্য চুক্তি, শুল্কনীতি, H-1B ভিসা এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী দিনে ওয়াশিংটনের এই নতুন ক্ষমতার সমীকরণ কী ভাবে কাজ করে, তার উপর।




