নিউজ ডেস্ক: ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এক তরুণীকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন জাপানি এক শিক্ষার্থী। উদ্দেশ্য ছিল কবিতা অনুবাদে সাহায্য নেওয়া। কিন্তু বাড়িতে আসার পর তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন ওই যুবক। এখানেই শেষ নয়, হত্যার পর তরুণীর মরদেহের অংশবিশেষ খেয়েছিলেন তিনি! এমন ভয়ংকর অপরাধের পরও জীবনে কখনও কারাভোগ করতে হয়নি তাঁকে। উল্টে দেশে ফিরে টেলিভিশনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন!
ঘটনাটি ১৯৮১ সালের ১১ জুনের। অপরাধীর নাম ইসেই সাগাওয়া। তখন তাঁর বয়স ৩২ বছর। তিনি প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন।
নিহত তরুণীর নাম রেনে হার্টেভেল্ট। ২৫ বছর বয়সি এই ডাচ শিক্ষার্থী ছিলেন সাগাওয়ার সহপাঠী। সেদিন কবিতা অনুবাদের কথা বলে রেনেকে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ডেকে আনেন সাগাওয়া। তরুণী যখন বসে কবিতা পড়ছিলেন, তখন পিছন থেকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন তিনি। এরপর কয়েক দিন ধরে মরদেহের অংশবিশেষ ভক্ষণ করেন এবং ঘটনার ছবি তুলে রাখেন। পরে দুটি স্যুটকেসে মরদেহের অবশিষ্টাংশ ভরে প্যারিসের বোয়া দ্য বুলোন এলাকার একটি হ্রদের কাছে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সন্দেহজনক আচরণের কারণে ধরা পড়ে যান তিনি। গ্রেফতারের পর হত্যার কথা স্বীকার করেন সাগাওয়া। কিন্তু মামলাটি এক অদ্ভুত আইনি জটিলতায় পড়ে। ফ্রান্সে মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় নেই বলে মত দেন। ফলে তাঁকে কারাগারের পরিবর্তে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
১৯৮৪ সালে তাঁকে জাপানে ফেরত পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, তিনি বিচার বোঝার মতো মানসিকভাবে সক্ষম। কিন্তু তত দিনে ফ্রান্সে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফরাসি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় মামলার নথিও জাপানকে দেয়নি। ফলে জাপানে নতুন করে বিচার শুরু করা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১৯৮৬ সালের অগস্টে মানসিক হাসপাতাল থেকে মুক্তি পান সাগাওয়া। এরপর ঘটে আরও বিস্ময়কর ঘটনা।
ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের জন্য অনুশোচনার পরিবর্তে নিজের অপরাধকে পরিচিতি ও অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন তিনি। টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত হতেন। হত্যাকাণ্ড নিয়ে বই লিখতেন। এমনকি পত্রিকায় ফুড রিভিউও লিখেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন তিনি। তাঁর অপরাধ নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মিত হয়। ব্রিটিশ রক ব্যান্ড দ্য রোলিং স্টোনসের একটি গানও তাঁর ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
২০২২ সালের ২৪ নভেম্বর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৭৩ বছর বয়সে মারা যান সাগাওয়া। অথচ রেনে হার্টেভেল্টের পরিবার কখনও আদালতে তাঁর হত্যার বিচার দেখতে পারেনি।
একজন তরুণীকে নির্মমভাবে হত্যার পরও অপরাধীর মুক্ত জীবন এবং গণমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ঘটনা আজও বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতা ও অপরাধকে বিনোদনে পরিণত করার প্রবণতার এক ভয়ংকর উদাহরণ হয়ে রয়েছে।




