ওয়াশিংটন: ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে রাশিয়ার। সেই যুদ্ধের আবহেই ইউরোপে ফের রুশ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ চালু করার উদ্যোগ নিচ্ছে আমেরিকা। আর সেই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের অবসান ঘটাতে মস্কো ও কিভের মধ্যে সমঝোতার পথ তৈরি করতে চাইছে ওয়াশিংটন। তারই অংশ হিসেবে ইউক্রেনের উপর দিয়ে ইউরোপে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ফের শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে আমেরিকার এই উদ্যোগে ইউরোপের একাধিক দেশের আপত্তি রয়েছে। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
সূত্রের খবর, গত সেপ্টেম্বর মাসে মস্কো ও কিভ সফরের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফ এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস ইউক্রেনের উপর দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে পৌঁছবে। তবে সরাসরি রাশিয়ার সংস্থার মাধ্যমে নয়, এই বাণিজ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থাকবে আমেরিকার কোনও সংস্থা। তাতে একদিকে যেমন রাশিয়ার গ্যাস ইউরোপের বাজারে ফের প্রবেশের সুযোগ পাবে, অন্যদিকে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্যও নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
শুধু তাই নয়, গ্যাস বিক্রি করে রাশিয়া যে অর্থ পাবে, তা যাতে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে, তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াশিংটন। আমেরিকার এক আধিকারিকের দাবি, তৃতীয় কোনও দেশে এসক্রো অ্যাকাউন্টে ওই অর্থ জমা রাখার কথা ভাবা হচ্ছে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সেই অর্থ সরাসরি রাশিয়ার হাতে পৌঁছবে না। অন্যদিকে, রাশিয়ার গ্যাস ইউক্রেনের উপর দিয়ে পরিবহণ হলে ট্রানজিট ফি বাবদ আর্থিক লাভ হবে কিভেরও।
এই প্রস্তাবের পিছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। ইউরোপে শীতের মরসুম শুরু হওয়ার আগে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের ভাণ্ডারে মজুতের পরিমাণও গত কয়েক বছরের তুলনায় কম। তার উপর ইরান যুদ্ধের জেরে পারস্য উপসাগরে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে বিকল্প জ্বালানির উৎস খুঁজতে চাপ বাড়ছে ইউরোপের উপর। আমেরিকার ধারণা, রাশিয়ার গ্যাস সরবরাহ ফের চালু হলে ইউরোপে জ্বালানির দাম কমানো সম্ভব হবে।
কিন্তু ওয়াশিংটনের এই পরিকল্পনায় বড় বাধা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে ইউরোপের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ৪৫ শতাংশ আসত রাশিয়া থেকে। যুদ্ধের পর মস্কোর উপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে সেই নির্ভরতা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইউরোপ। বর্তমানে ইউরোপের মোট গ্যাসের মাত্র ১১ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে। অন্যদিকে, আমেরিকা থেকে আসা এলএনজি ইউরোপের মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান দেয়।
ইইউ ইতিমধ্যেই ২০২৭ সালের শেষের মধ্যে রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করার আইন করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের জ্বালানি বিষয়ক কমিশনার ড্যান ইয়র্গেনসেনও স্পষ্ট জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের অবসান হলেও মস্কোর গ্যাসের উপর নির্ভরতা ফেরানো উচিত নয়। তাঁর বক্তব্য, রাশিয়াকে বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাব ইউরোপের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
আমেরিকার এই উদ্যোগকে ঘিরে ইউক্রেনের অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যেই ইউক্রেনের পরিকাঠামো এবং জ্বালানি ব্যবস্থার উপর লাগাতার হামলা চালাচ্ছে মস্কো। পাল্টা রুশ তেল শোধনাগারগুলিকেও নিশানা করছে কিভ। গত শুক্রবার থেকে তিন দিনে রাশিয়ার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এর আগে ট্রাম্পের চাপের মুখে প্রায় দু’সপ্তাহ রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রেখেছিল কিভ। কিন্তু রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা চালানো অব্যাহত রাখায় ফের পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে তারা।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও আমেরিকার মধ্যে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নভেম্বরের মাঝামাঝি সংযুক্ত আরব আমিরশাহির আবু ধাবিতে ওই বৈঠক হওয়ার কথা। তার আগে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে সমঝোতা তৈরি করতে চাইছে ওয়াশিংটন। তবে রাশিয়া এখনও আমেরিকার প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি।
ট্রাম্পের এই উদ্যোগ তাঁর প্রথম দফার প্রেসিডেন্ট থাকার সময়কার অবস্থানের সঙ্গেও কার্যত উল্টো। তখন জার্মানির সঙ্গে রাশিয়ার নর্ড স্ট্রিম-২ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এমনকি ২০১৯ সালে ওই প্রকল্পের উপর নিষেধাজ্ঞাও চাপিয়েছিল তাঁর প্রশাসন। ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, রাশিয়ার গ্যাসের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে ইউরোপ মস্কোর রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়বে। অথচ এখন ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে সেই রাশিয়ার গ্যাসকেই আলোচনার হাতিয়ার করতে চাইছে তাঁর প্রশাসন।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে জ্বালানি বাণিজ্যকে কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু রাশিয়ার উপর নির্ভরতা কমানোর ইউরোপীয় সিদ্ধান্ত, ইউক্রেনের নিরাপত্তা এবং মস্কোর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক—এই তিনটি প্রশ্নের মীমাংসা না হলে ওয়াশিংটনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়া কঠিন। যুদ্ধ থামানোর জন্য রুশ গ্যাসকে ফের ইউরোপের বাজারে ফেরানোর এই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার।




