কলকাতা: থানায় থানায় কালীপুজো করতে হবে। শুধু পুজো নয়, প্রতিটি থানায় কালীমূর্তি রাখারও প্রয়োজন রয়েছে। কয়েক দিন আগে বীরভূমের সিউড়িতে পুলিশের বিজয়া সম্মিলনীর মঞ্চ থেকে এমনই নিদান দিয়েছিলেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সেই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছিল বিতর্ক। এ বার সেই বিতর্কের জবাব দিতে গিয়ে আরও এক ধাপ এগোলেন মন্ত্রী। জানিয়ে দিলেন, কেন থানায় কালীপুজো প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। এমনকি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে ‘প্রায়শ্চিত্ত’ করার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর যুক্তি, গত কালীপুজোয় দক্ষিণ ২৪ পরগনায় মা কালীর মূর্তিকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হয়েছিল। সেই ঘটনার প্রায়শ্চিত্ত করতেই এ বার থানায় থানায় কালীপুজোর আয়োজন করা উচিত।
সিউড়ির অনুষ্ঠানে জগন্নাথের বক্তব্য ছিল, পুলিশ সংস্কৃতির অঙ্গ কালীপুজো। স্কুলে যেমন সরস্বতী পুজো বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে রয়েছে, তেমনই থানাতেও কালীপুজোর পরম্পরা থাকা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, থানায় কালীমূর্তি থাকলে অপরাধী থেকে পুলিশকর্মী—সকলেই দেবীর সামনে প্রার্থনা করতে পারবেন। চোর থানায় ঢুকলে মা কালীর কাছে মুক্তির প্রার্থনা করবে, আর পুলিশ অভিযানে বেরোনোর আগে প্রার্থনা করবে অভিযুক্তকে ধরে ফেরার জন্য। নিজের বক্তব্যের সমর্থনে রঘু ডাকাতের প্রসঙ্গও তুলেছিলেন তিনি। লোককথা অনুযায়ী, ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে রঘু ডাকাতও মা কালীর পুজো করতেন বলে মনে করিয়ে দেন মন্ত্রী।
কিন্তু কেন পুলিশকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে? এই প্রশ্নের জবাবে জগন্নাথের বক্তব্য, গত বছরের কালীপুজোয় দক্ষিণ ২৪ পরগনায় মা কালীর মূর্তিকে প্রিজন ভ্যানে তোলার ঘটনা ঘটেছিল। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশই সেই কাজ করেছিল। সেই ঘটনার পর এ বার কালীপুজোয় থানায় থানায় পুজো করে পুলিশকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। মন্ত্রীর কথায়, রাজ্যে এখন সনাতনী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে পুলিশকে তাই গত বছরের ঘটনার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলের প্রসঙ্গও টেনেছেন জগন্নাথ। তাঁর দাবি, জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন থানায় কালীপুজো নিয়ে কোনও আপত্তি ওঠেনি। পরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে সংখ্যালঘু দফতর তৈরি এবং মুসলিম ভোটের রাজনীতির প্রসঙ্গ তুলে থানায় কালীপুজো বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে মা কালীর মূর্তিকে প্রিজন ভ্যানে তোলার ঘটনাকেও সেই বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করেছেন মন্ত্রী।
সংবিধানের প্রসঙ্গও তুলেছেন জগন্নাথ। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের মন্ত্রী হিসাবে তিনি সংবিধানের প্রতি আস্থা ও আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন। সেই শপথে ঈশ্বরের নামও রয়েছে। তাই ঈশ্বরের প্রতি আস্থা রেখে পুলিশ সংস্কৃতির অঙ্গ হিসাবে থানায় কালীপুজোর আয়োজনের কথা বলছেন তিনি। তাঁর দাবি, এই প্রস্তাবের মধ্যে ধর্মীয় বিভাজনের কোনও বিষয় নেই। তবে মন্ত্রীর এই বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক থামেনি। সরকারি প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় আচারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা। সমালোচকদের বক্তব্য, পুলিশ একটি সাংবিধানিক ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখাই পুলিশের অন্যতম দায়িত্ব। সেখানে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের পুজোকে থানার সংস্কৃতির অঙ্গ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রস্তাব কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
অন্য দিকে, জগন্নাথের বক্তব্য, থানায় কালীপুজো নতুন কোনও বিষয় নয়। বহু জায়গায় দীর্ঘদিন ধরেই পুলিশকর্মীরা নিজেদের উদ্যোগে পুজোর আয়োজন করেন। তাঁর দাবি, সেই পরম্পরাকেই আরও জোরালো করতে চাইছেন তিনি। ফলে থানায় থানায় কালীপুজোর প্রস্তাবের সঙ্গে এ বার জুড়ে গেল গত বছরের একটি বিতর্কিত ঘটনার ‘প্রায়শ্চিত্ত’-এর যুক্তিও। মন্ত্রীর ব্যাখ্যায় বিতর্ক মিটবে, নাকি আরও বাড়বে, এখন সেটাই দেখার।




