নিউজ ডেস্ক: ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে উত্তপ্ত ঢাকা-সহ একাধিক শিল্পাঞ্চল। রবিবার মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও পথ অবরোধ, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আবার কোথাও গাড়ি ও কারখানায় আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আধাসেনা মোতায়েনের পাশাপাশি জরুরি বৈঠকে বসেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অশান্তির ঘটনায় মিরপুরে ২৯ জনকে আটক এবং গাজীপুরে ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। তা বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জানাচ্ছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। এই দাবিতে কয়েক দিন ধরেই বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ চলছিল। এদিন তা আরও তীব্র হয়। মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়ান শ্রমিকেরা। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। পাল্টা লাঠিচার্জ, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে পুলিশ। মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রো স্টেশনের কাছে পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানেও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল সংযোগকারী রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের পাঁচ প্ল্যাটুন বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
অশান্তির জেরে সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ১৭৭টি পোশাক কারখানায় এক দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হওয়ায় শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী তাঁর সংযুক্ত আরব আমিরশাহি সফর বাতিল করেন। রবিবার দুপুরেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। শ্রমিকদের দাবি এবং শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় সেখানে।
এর পরেই শ্রমিকদের বেতন সংক্রান্ত দাবিদাওয়া খতিয়ে দেখতে ছ’সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ঘোষণা করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রক। শ্রমমন্ত্রী জানান, সরকার শ্রমিকদের দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বোর্ড দ্রুত কাজ শুরু করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আবেদনও জানান। তবে বোর্ড গঠনের ঘোষণার পরেও বিক্ষোভ পুরোপুরি থামেনি। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৩টে পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ চলে। তার জেরে ঢাকা-টাঙ্গাইল রাস্তায় প্রায় ছ’ঘণ্টা যান চলাচল ব্যাহত হয়।
সন্ধ্যায় পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ফের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসেন তারেক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, শ্রমমন্ত্রী আরিফুল-সহ একাধিক মন্ত্রী ও উপদেষ্টা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং তাঁদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও রফতানি সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে হিংসা, ভাঙচুর এবং অশান্তি তৈরির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। বন্ধ কারখানাগুলি দ্রুত খুলে স্বাভাবিক উৎপাদন শুরু করার জন্য মালিক ও শ্রমিক—দু’পক্ষকেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছনোর আবেদন জানিয়েছে সরকার।
মিরপুরে পুলিশের গাড়ি পোড়ানো এবং ভাঙচুরের ঘটনায় আটক ২৯ জনের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলির যোগ রয়েছে বলে ঢাকা পুলিশের দাবি। গাজীপুরে অশান্তিতে উস্কানি, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে ধৃত ৯ জনও আওয়ামী লীগের সদস্য বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। তবে এই অভিযোগগুলির বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানা যায়নি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাকশিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। দেশের রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে এই ক্ষেত্র থেকে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ বাংলাদেশ। ফলে শ্রমিকদের বেতন নিয়ে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ও রফতানিতে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এক দিকে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি, অন্যদিকে শিল্পের উৎপাদন সচল রাখার চাপ—এই দুইয়ের মধ্যে সমাধানের পথ খুঁজছে তারেক রহমানের সরকার।




