বেজিং: স্পাইডারম্যানের ছবিতে গ্রিন গবলিনের উড়ন্ত বোর্ড দেখেছেন অনেকেই। এ বার সেই কল্পবিজ্ঞানের দৃশ্যকেই বাস্তবে রূপ দিলেন চিনের এক যুবক। কোনও সংস্থার তৈরি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নয়, নিজের হাতে তৈরি উড়ন্ত হোভারবোর্ডে চেপে নদী, পাহাড়, এমনকি শহরের উপর দিয়েও উড়ে বেড়ালেন তিনি। নিরাপদে অবতরণও করলেন একটি গিরিখাতে। ২৬ বছরের ওই যুবকের কীর্তি দেখে বিস্মিত নেটদুনিয়া। তাঁর তৈরি বোর্ডটি একসঙ্গে চার জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওজন বহন করতে সক্ষম বলেও দাবি করা হয়েছে।
ওই যুবকের নাম সং শিংইউ। চিনের হুবেই প্রদেশের এনশি এলাকার বাসিন্দা তিনি। সমাজমাধ্যমে ‘অ্যামেজিং আয়ু’ নামেই বেশি পরিচিত। উড়ন্ত যন্ত্র তৈরির নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিডিয়ো পোস্ট করে ইতিমধ্যেই ৩০ লক্ষেরও বেশি অনুগামী তৈরি করেছেন তিনি। গত ১৫ অক্টোবর নিজের তৈরি উড়ন্ত বোর্ডে চেপে আকাশে ওড়ার একটি ভিডিয়ো প্রকাশ করেন সং। তাতেই দেখা যায়, কখনও ইয়াংসি নদীর উপর দিয়ে, কখনও পাহাড়ের চূড়া ঘেঁষে, আবার কখনও শহরের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছেন তিনি। চিনের জাতীয় দিবসের ছুটির সময় এই পরীক্ষামূলক উড়ান সম্পন্ন করেন সং।
https://x.com/StarSnap_1/status/2116360526435635482?a=YhBTMQfiEJ3knS65JzU&s=20
তবে এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দীর্ঘ লড়াই। ছোটবেলায় গ্রামীণ পরিবেশে বড় হওয়া সং মাত্র ১৪ বছর বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে বাবার কাঠের কারখানায় কাজ শুরু করেন। একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বিমান পরীক্ষার দৃশ্য দেখেই উড়ানের প্রতি আগ্রহ জন্মায় তাঁর। এর পর পুরনো যন্ত্রাংশ, বাতিল সামগ্রী জোগাড় করে তৈরি করতে শুরু করেন ছোট ছোট বিমান। পেশাদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রশিক্ষণ না থাকলেও ইন্টারনেট ঘেঁটে নিজেই শিখেছেন যন্ত্রবিদ্যা, উড়ান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তির নানা খুঁটিনাটি।
২০২২ সালের জুনে নিজের পরীক্ষাগার তৈরির জন্য ঋণ নেন সং। একটি পরিত্যক্ত কাঠের শেডকে বদলে ফেলেন গবেষণাগারে। কিন্তু পথ সহজ ছিল না। প্রতারণার শিকার হয়ে প্রায় ২৪ লক্ষ ইউয়ান, ভারতীয় মুদ্রায় কয়েক কোটি টাকার ঋণের বোঝা চাপে তাঁর উপর। পরে প্রযুক্তি সংস্থা ইনস্টা৩৬০ তাঁর কাজের জন্য ১৮ লক্ষ ইউয়ান আর্থিক সহায়তা দেয়।
এর আগেও একাধিক বিপজ্জনক পরীক্ষা চালিয়েছেন সং। ২০২৪ সালের মে মাসে টানা ২২ দিন ধরে একটি রিমোট নিয়ন্ত্রিত বিমান তৈরি করেছিলেন তিনি।
https://x.com/XinhuaTravel/status/2115322772687872250?a=FHvU0LqptUJUu75BKo0&s=20
হিলিয়াম বেলুনের সাহায্যে সেটিকে বায়ুমণ্ডলের অনেক উপরে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু প্রবল ঝড়ে তাঁর পরীক্ষাগার ও উড়ানের সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যায়। এর ছ’মাস পর আরও ভয়ঙ্কর এক পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। নিজের তৈরি জেটচালিত উড়ন্ত যন্ত্র পরে প্রায় ৫ হাজার মিটার উচ্চতা থেকে হেলিকপ্টার থেকে ঝাঁপ দেন। কিন্তু তাঁর মূল প্যারাশুটটি খুলতে ব্যর্থ হয়। শেষ মুহূর্তে মাত্র ৬০০ মিটার উচ্চতায় খুলেছিল বিকল্প প্যারাশুট। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি। সেই পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা আগেই নিজের শেষ ইচ্ছাপত্র রেকর্ড করেছিলেন সং। একই সঙ্গে অন্যদের এমন বিপজ্জনক পরীক্ষা অনুসরণ না করার পরামর্শও দিয়েছিলেন।
এ বার তাঁর লক্ষ্য ছিল স্পাইডারম্যানের গ্রিন গবলিনের উড়ন্ত বোর্ডের মতো একটি যন্ত্র তৈরি করা। প্রথমে পাঁচটি ছোট টার্বোজেট ইঞ্জিন ব্যবহার করে বোর্ডটি তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরীক্ষার সময় ইঞ্জিনগুলিতে আগুন ধরে যায়। পুড়ে যায় জ্বালানি সরবরাহের পাইপ এবং বৈদ্যুতিক তার। এর পর পরীক্ষার তথ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বিশ্লেষণ করেন সং। তাতে ইঞ্জিনগুলির অবস্থানগত সমস্যার কথা উঠে আসে। গরম বাতাস ফিরে এসে ইঞ্জিনের মধ্যে ঢুকে পড়ায় আগুন লাগার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছিল। সেই পরামর্শ মেনেই জেট ইঞ্জিনের বদলে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
https://x.com/NotInYourFeed/status/2116084806182215937?a=eDn7SOvM-8QI_eTGWoI&s=20
প্রায় দু’মাসের পরিশ্রমে তৈরি হয় নতুন উড়ন্ত বোর্ড। তাতে রয়েছে ১০টি ব্রাশলেস বৈদ্যুতিক মোটর। প্রতিটি মোটর ৩০ কিলোগ্রামেরও বেশি ওজন তোলার ক্ষমতা রাখে। সব ক’টি মোটরের সম্মিলিত শক্তি চার জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওজন বহনের জন্য যথেষ্ট বলে দাবি সংয়ের। আঙুলে পরা একটি বিশেষ রিংয়ের মাধ্যমে বোর্ডটির গতি নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য ব্যবহার করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা। কানে ব্লুটুথ ইয়ারফোন লাগিয়ে উড়ানের সময় শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখার নির্দেশ পান তিনি।
তবে প্রথম পরীক্ষাতেই সাফল্য আসেনি। বোর্ডের ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে চোটও পেয়েছিলেন সং। তার পর টানা ১০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। অবশেষে চিনের জাতীয় দিবসের ছুটিতে নিজের শহর এনশিতে সফল পরীক্ষামূলক উড়ান সম্পন্ন করেন তিনি। ইয়াংসি নদী পেরিয়ে পাহাড়ের উপর দিয়ে উড়ে যান। পরে একটি গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে উড়ে নিরাপদে অবতরণ করেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, একটি পরীক্ষামূলক উড়ান দু’মিনিটের কিছু বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল। দূরত্ব ছিল ৩০০ মিটারেরও বেশি।
ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসতেই সমাজমাধ্যমে কার্যত হইচই পড়ে যায়। অনেকেই প্রথমে সেটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বলে সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু সং দাবি করেছেন, উড়ানের দৃশ্য সম্পূর্ণ বাস্তব। কোনও কৃত্রিম দৃশ্য বা বিশেষ প্রযুক্তির কারসাজি নেই তাতে। তাঁর এই কীর্তির ভিডিয়ো চিনের সমাজমাধ্যম ডুয়িনে লক্ষ লক্ষ মানুষের নজর কেড়েছে।
নিজের সাফল্য নিয়ে সংয়ের বক্তব্য, একেবারে শূন্য থেকে শুরু করেছিলেন তিনি। তাই ব্যর্থতাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সাহস করে এগিয়ে যাওয়াই তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে তাঁর এই বিপজ্জনক পরীক্ষার অনুকরণ করতে কাউকে উৎসাহ দেননি তিনি। বরং নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই সতর্ক করেছেন অন্যদের। এখন তাঁর লক্ষ্য, এই উড়ন্ত বোর্ডকে আরও উঁচুতে এবং আরও বেশি সময় ধরে ওড়ানোর প্রযুক্তি তৈরি করা। কল্পবিজ্ঞানের পর্দা থেকে বাস্তবের আকাশে সংয়ের এই উড়ান তাই নতুন করে প্রযুক্তিপ্রেমীদের কৌতূহল বাড়িয়েছে।




