বিশেষ প্রতিবেদন: প্রায় চার দশক আগে কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল প্রাণীটি। মনে করা হয়েছিল, পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে গিয়েছে তার অস্তিত্ব। কিন্তু প্রকৃতির সেই হারিয়ে যাওয়া বাসিন্দারই দেখা মিলল ফের। শুধু তাই নয়, নিজেদের বংশবিস্তার করে সংখ্যাও বাড়াচ্ছে তারা। আমেরিকার দক্ষিণ ডাকোটার ব্যাডল্যান্ডস ন্যাশনাল পার্কে ফিরে এসেছে বিরল প্রজাতির ব্ল্যাক-ফুটেড ফেরেট। একসময় বিলুপ্তির মুখে দাঁড়ানো এই প্রাণীর সংখ্যা এখন ওই জাতীয় উদ্যানে প্রায় ১২০। সংরক্ষণে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফলেই সম্ভব হয়েছে এই প্রত্যাবর্তন।
বেজি গোত্রের এই ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীটির চেহারা বেশ আকর্ষণীয়। হলদেটে শরীর, কালো পা, মুখের চারপাশে কালো ছোপ এবং লেজের ডগায় কালো দাগ—এই বৈশিষ্ট্যগুলির জন্যই তার নাম ব্ল্যাক-ফুটেড ফেরেট। মূলত নিশাচর প্রাণী। দিনের অধিকাংশ সময় মাটির নীচে গর্তের মধ্যে কাটায়। রাত নামলে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। একা থাকতে পছন্দ করলেও প্রজননের সময় এবং সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে দলবদ্ধ থাকার প্রবণতা দেখা যায়।
একসময় উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ তৃণভূমিতে এই প্রাণীর অবাধ বিচরণ ছিল। কিন্তু কৃষিকাজের প্রসার, বাসস্থান ধ্বংস এবং রোগের প্রকোপে দ্রুত কমতে থাকে তাদের সংখ্যা। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে তাদের প্রধান খাদ্য প্রেইরি ডগের সংখ্যা কমে যাওয়ায়। কৃষিজমির ক্ষতি করে, এই অভিযোগে বহু বছর ধরে নির্বিচারে মারা হয়েছে প্রেইরি ডগদের। ফলে খাবারের অভাবে অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে ব্ল্যাক-ফুটেড ফেরেটও।
১৯৬৭ সালে বিপন্ন প্রজাতির তালিকায় জায়গা হয় তাদের। ১৯৭৪ সালের মধ্যে শেষ পরিচিত বন্য জনসংখ্যাটিও হারিয়ে যায়। ১৯৮০ সালে বন্দি অবস্থায় থাকা শেষ প্রাণীটির মৃত্যুর পর কার্যত বিলুপ্ত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল এই প্রজাতিকে।
তবে আশার আলো দেখা যায় ১৯৮১ সালে। আমেরিকার ওয়াইয়োমিংয়ের মিটিটসে এলাকায় একটি খামারের কুকুরের মুখে ধরা পড়ে একটি ব্ল্যাক-ফুটেড ফেরেট। স্থানীয় এক ট্যাক্সিডার্মিস্ট প্রাণীটির গুরুত্ব বুঝতে পেরে খবর দেন বিশেষজ্ঞদের। অনুসন্ধান চালিয়ে বিজ্ঞানীরা ওই এলাকায় প্রায় ১৩০টি ফেরেটের সন্ধান পান। কিন্তু আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।
সংক্রামক রোগের প্রকোপে ১৯৮৭ সালের মধ্যে বেঁচে ছিল মাত্র ১৮টি। শেষ পর্যন্ত ওই প্রাণীগুলিকে বন্দি অবস্থায় নিয়ে গিয়ে শুরু হয় প্রজনন কর্মসূচি। বর্তমানে জীবিত ব্ল্যাক-ফুটেড ফেরেটদের বংশধারা ওই ১৮টি প্রাণীর সঙ্গেই যুক্ত।
এর পর শুরু হয় দীর্ঘ সংরক্ষণ অভিযান। বন্দি অবস্থায় প্রজননের মাধ্যমে সংখ্যা বাড়িয়ে বিভিন্ন জাতীয় উদ্যানে ফের তাদের ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন বিজ্ঞানীরা। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ ডাকোটার ব্যাডল্যান্ডস ন্যাশনাল পার্কের কোনাটা বেসিন এলাকায় ১৪৭টি ফেরেটকে প্রকৃতির কোলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
ধীরে ধীরে সাফল্য আসতে শুরু করে। ২০০৭ সালে ওই এলাকা থেকে ৩৩টি ফেরেট ধরে উইন্ড কেভ ন্যাশনাল পার্কে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও নতুন করে জনসংখ্যা গড়ে ওঠে। তবে এই লড়াইয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সিলভাটিক প্লেগ। ২০০৮ সালে কোনাটা বেসিন এলাকায় এই রোগের সংক্রমণ ধরা পড়ে। মাছির মাধ্যমে ছড়ানো এই রোগ প্রেইরি ডগ এবং ব্ল্যাক-ফুটেড ফেরেট—দু’টির পক্ষেই প্রাণঘাতী। কারণ, ফেরেটদের খাদ্যের বড় অংশ জুড়েই রয়েছে প্রেইরি ডগ। ফলে খাদ্যপ্রাণী আক্রান্ত হলে বিপন্ন হয়ে পড়ে ফেরেটেরাও।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ফেরেটদের টিকা দেওয়ার পাশাপাশি প্রেইরি ডগের গর্তে কীটনাশক প্রয়োগ করেন বিজ্ঞানীরা। এমনকি প্রেইরি ডগদের জন্য মুখে খাওয়ার টিকাও তৈরি করা হয়। ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাডল্যান্ডস ন্যাশনাল পার্কে প্রায় ১২০টি ব্ল্যাক-ফুটেড ফেরেট রয়েছে। তার মধ্যে কোনাটা বেসিন এলাকায় প্রায় ৮০টির বসবাস। সবচেয়ে আশার কথা, এই এলাকায় ফেরেটেরা নিজেদের মধ্যে প্রজনন করে বংশবিস্তার করতে পারছে। অর্থাৎ, শুধু বন্দি অবস্থায় জন্মানো প্রাণী ছেড়ে দিয়েই তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে না। প্রকৃতির পরিবেশেই নিজেদের জনসংখ্যা ধরে রাখার ক্ষমতা ফিরে পাচ্ছে তারা।
তবে বিপদ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। বাসস্থান ধ্বংস, সংক্রামক রোগ এবং খাদ্যপ্রাণীর অভাব এখনও এই প্রজাতির অস্তিত্বের পথে বড় বাধা। বন্য পরিবেশে তাদের সংখ্যা আরও বাড়ানোই এখন বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য। একসময় যে প্রাণীকে পৃথিবী থেকে হারিয়ে গিয়েছে বলে মনে করা হয়েছিল, আজ তারাই ফের নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। ব্যাডল্যান্ডসের এই সাফল্য প্রমাণ করল, সময়মতো পরিকল্পিত সংরক্ষণ ও বিজ্ঞানীদের নিরলস প্রচেষ্টা থাকলে বিলুপ্তির কিনারা থেকেও কোনও প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।




