ওয়াশিংটন: যুদ্ধ থামার কোনও স্থায়ী নিশ্চয়তা নেই। বরং আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। এক দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত অধিকাংশ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। এখন হামলার জন্য বাকি রয়েছে মাত্র এক বা দু’টি জায়গা। অন্য দিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের হুঁশিয়ারি, আমেরিকা বা ইজরায়েল নতুন করে আঘাত হানলে তার জবাব দেওয়া হবে অবিলম্বে। শুধু তা-ই নয়, পাল্টা আঘাতের ক্ষেত্রে কোনও ভৌগোলিক সীমারেখাও মানবে না তেহরান। ফলে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরেই পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
শনিবার ফ্লরিডায় নিজের বাসভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের পরমাণু পরিকাঠামোর বিরুদ্ধে আমেরিকার অভিযান অনেকটাই সফল হয়েছে। তাঁর কথায়, “ওদের পরমাণু কর্মসূচি আমরা ধ্বংস করেছি। এখনও এক বা দু’টি জায়গার কাজ বাকি রয়েছে। তবে তা করতে আমাদের ১০ মিনিটও লাগবে না।” এ প্রসঙ্গে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর উল্লেখ করেন তিনি। ওই এলাকাটিকে গুরুত্বপূর্ণ পরমাণু পরিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন।
চলতি সপ্তাহেই আমেরিকা ইরানে নতুন করে হামলা চালাতে পারে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের মুখে পড়েন ট্রাম্প। জবাবে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল, “এ রকম বোকা প্রশ্ন করছেন কেন? ধরুন, আমি যদি তা করতাম, তা হলে কি আপনাদের জানাতাম?” ট্রাম্পের এই মন্তব্যে নতুন করে সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়নি। বরং তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সামরিক বিকল্প এখনও মার্কিন প্রশাসনের বিবেচনায় রয়েছে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরেই পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই শনিবার দেশের শীর্ষ সামরিক কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম তাঁর সঙ্গে সামরিক নেতৃত্বের বৈঠকের খবর প্রকাশ্যে এল। গত ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় তাঁর বাবা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর মার্চ মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন মোজতবা। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
সামরিক কর্তাদের উদ্দেশে মোজতবার বার্তা, যে কোনও ধরনের হুমকির জবাব দিতে হবে দ্রুত, জোরালো ভাবে এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা ছাড়াই। তাঁর কথায়, “যে কোনও স্তরের বা ধরনের হুমকির মোকাবিলা করতে হবে অবিলম্বে, কার্যকর ভাবে এবং ভৌগোলিক সীমারেখার তোয়াক্কা না করে।” একই সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পদকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রস্তুতি নিয়েও বার্তা দিয়েছেন সর্বোচ্চ নেতা। পারস্য উপসাগরের উপকূল, হরমুজ প্রণালী, ওমান উপসাগর এবং দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে সেনার প্রস্তুতি কতটা, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। নতুন করে হামলা হলে দ্রুত পাল্টা আঘাত হানার মতো সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ভোট মিটলেই কি ফের অভিযান?
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে নতুন জল্পনা। আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে ইরানে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান শুরু করতে চাইছেন না ট্রাম্প—এমনই ধারণা কূটনৈতিক মহলের একাংশের। কারণ, এই নির্বাচনের ফলের উপর নির্ভর করছে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার সম্ভাবনা। যুদ্ধের অভিঘাত, জ্বালানির দাম এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।
গত সপ্তাহেই ইরানের বিরুদ্ধে ফের সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ‘এপিক ফিউরি’ নামে আমেরিকার আগের সামরিক অভিযানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেছিলেন, ফের ‘ছোটখাটো’ অভিযান চালানো হতে পারে। অন্য দিকে, ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকতে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশকে বার্তা দিয়েছে ওয়াশিংটন। যদিও ট্রাম্প এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলেই খবর।
মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োও শনিবার জানিয়েছেন, ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেননি প্রেসিডেন্ট। আটলান্টায় জি-২০ গোষ্ঠীর বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে সামরিক লক্ষ্য অর্জনের ক্ষমতা আমেরিকার রয়েছে। তবে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখতেই আগ্রহী ওয়াশিংটন। তাঁর বক্তব্য, সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে এখনই কোনও ঘোষণা করার নেই।
আলোচনার টেবিলেও চলছে টানাপড়েন
যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যেই কূটনৈতিক স্তরে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে দুই পক্ষ। শনিবার কাতারের রাজধানী দোহায় ইরান ও কাতারের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা হয়েছে। তার আগে শুক্রবার তেহরানে ইরান ও কাতারের প্রতিনিধিদের মধ্যে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বৈঠক হয়। ওই আলোচনার সঙ্গে ওয়াশিংটনেরও নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের দাবি।
সম্প্রতি মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মহসেন রেজাইকে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। ট্রাম্পের নির্দেশেই ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে খবর। যদিও চিঠির গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর দাবি, ইরানে চিকিৎসা সরঞ্জাম পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়েই মূলত আলোচনা করতে চেয়েছিলেন তিনি।
ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও জানিয়েছেন, ভ্যান্সের চিঠি নিয়ে তেহরানে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের কোনও পরিকল্পনা নেই। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা চললেও ওয়াশিংটনের কাছে ইরানের শর্ত স্পষ্ট বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইরানের প্রস্তাব, মার্কিন অবরোধ তুলে নিতে হবে, আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে তেহরানের প্রস্তাবিত ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এর পরেই জলপথটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ করা সম্ভব। অন্য দিকে, কাতারের তরফে আনা সাত দিনের আস্থা তৈরির প্রস্তাব তেহরানের পছন্দ হয়নি বলেই খবর।
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
এই সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এবং জ্বালানি সরবরাহে তার প্রভাব পড়ে। যুদ্ধের সময় ইরানের তরফে এই জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড়সড় ধাক্কা লেগেছিল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলার পরেই পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের সূত্রপাত। পাল্টা আঘাতে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। পরে ১৭ জুন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ১৪ দফা সমঝোতায় পৌঁছেছিলেন বলে খবর। কিন্তু সেই সমঝোতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। জুলাই মাসে ট্রাম্প চুক্তি কার্যত বাতিল বলে ঘোষণা করেন। তার পর থেকে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা থেকেই গিয়েছে।
এক দিকে ট্রাম্পের সামরিক হুঁশিয়ারি, অন্য দিকে মোজতবার ভৌগোলিক সীমাহীন পাল্টা আঘাতের বার্তা—দুইয়ের মাঝে কূটনৈতিক আলোচনা কতটা সফল হয়, এখন সেটাই দেখার। বিশেষ করে ৩ নভেম্বরের মার্কিন ভোটের পর ওয়াশিংটন কোন পথে হাঁটে, তার উপরেই নির্ভর করতে পারে পশ্চিম এশিয়ার আগামী দিনের পরিস্থিতি।




