পোল্যান্ড: আদালতের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নিয়েই কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিল পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ। দেশের সাংবিধানিক আদালতের প্রধান ও উপপ্রধান বিচারপতিকে এক মাসের জন্য দায়িত্ব থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত ঘিরে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, আদালত চত্বরে মোতায়েন করতে হয়েছে দাঙ্গা দমন বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে আটক হয়েছেন তিন জন। আর এই অশান্তির জেরে সেনেগাল সফরে যাওয়ার পথে মাঝআকাশ থেকেই বিমান ঘুরিয়ে দেশে ফিরেছেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি।
ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত বা কনস্টিটিউশনাল ট্রাইব্যুনাল। আদালতের প্রধান বিচারপতি বোগদান শভিয়েনচকোভস্কি এবং উপপ্রধান বিচারপতি বার্তোমিয়েজ সোখানস্কিকে এক মাসের জন্য দায়িত্ব থেকে সরানোর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি আন্না কোরভিন-পিওত্রোভস্কা। তাঁর অভিযোগ, আদালতের নেতৃত্ব সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত নতুন বিচারপতিদের দায়িত্ব গ্রহণে বাধা দিচ্ছে। এর ফলে আদালতের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে এবং বিচারব্যবস্থার নিয়মও লঙ্ঘিত হচ্ছে।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নারাজ আদালতের বর্তমান নেতৃত্ব। সাংবিধানিক আদালতের তরফে দাবি করা হয়েছে, শভিয়েনচকোভস্কিই এখনও আদালতের প্রধান এবং সোখানস্কিই উপপ্রধান বিচারপতির দায়িত্বে রয়েছেন। আদালতের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিতে এই সাসপেনশনের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এমনকি গোটা ঘটনাকে ‘অভ্যুত্থান’ বলেও অভিযোগ করেছে আদালতের নেতৃত্ব। ফলে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃত্ব নিয়েই তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা।
এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার আদালত চত্বরে উত্তেজনা ছড়ায়। বিক্ষোভকারীদের একাংশ আদালতের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছোড়ার অভিযোগও উঠেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দাঙ্গা দমন বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনায় তিন জনকে আটক করা হয়েছে। তবে পুলিশ আদালত ভবনের ভিতরে প্রবেশ করেনি বলে জানানো হয়েছে।
অন্য দিকে, ঘটনার গুরুত্ব বুঝে বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেন প্রেসিডেন্ট নাভরোৎস্কি। সেনেগালের উদ্দেশে রওনা দিয়েও মাঝপথ থেকে বিমান ঘুরিয়ে দেশে ফেরেন তিনি। সমাজমাধ্যমে তাঁর বক্তব্য, এমন পরিস্থিতিতে দেশের প্রেসিডেন্টের পোল্যান্ডেই থাকা প্রয়োজন। দেশে ফিরে তিনি সুপ্রিম কোর্টের প্রথম সভাপতি জবিগনিয়েভ কাপিনস্কির সঙ্গে বৈঠকও করেন। আদালতের অচলাবস্থা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির কর্তৃত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন একাধিক মহল।
প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টুস্কের সরকার অবশ্য এই পদক্ষেপকে বিচারব্যবস্থায় আইনের শাসন ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ বলেই ব্যাখ্যা করছে। টুস্কের বক্তব্য, বিচারব্যবস্থার সংস্কার একটি কঠিন এবং কখনও কখনও যন্ত্রণাদায়ক প্রক্রিয়া। কিন্তু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা ছাড়া অন্য কোনও পথ নেই। বিচারমন্ত্রী ওয়ালদেমার জুরেকও আদালতের প্রধান ও উপপ্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে তাঁদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে তাঁদের বিচারবিভাগীয় দায়মুক্তি প্রত্যাহারের উদ্যোগ নিয়েছেন।
তবে বিরোধী দল আইন ও ন্যায়বিচার পার্টি বা পিআইএস এই পদক্ষেপকে সরাসরি সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহার বলে দাবি করেছে। দলের নেতা ইয়ারোস্লাভ কাচিনস্কি-সহ একাধিক বিরোধী নেতা আদালতের বাইরে বিক্ষোভে যোগ দেন। তাঁদের অভিযোগ, সরকার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের উপর বেআইনি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। অন্য দিকে, সরকারের দাবি, আগের সরকারের আমলে বিচারব্যবস্থার যে রাজনৈতিকীকরণ হয়েছিল, তা কাটিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনাই তাদের লক্ষ্য।
বিতর্কের সূত্রপাত ২০১৫ সালে
পোল্যান্ডের বিচারব্যবস্থা নিয়ে এই সংঘাত নতুন নয়। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আইন ও ন্যায়বিচার পার্টি ক্ষমতায় থাকার সময়ে বিচারপতি নিয়োগ এবং আদালতের কাঠামো নিয়ে একাধিক সংস্কার করা হয়েছিল। সেই সংস্কার নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-সহ বিভিন্ন মহলে বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
২০২৩ সালে ডোনাল্ড টুস্কের নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারব্যবস্থায় সংস্কার এবং আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া শুরু হতেই নতুন করে সংঘাত বাধে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট নাভরোৎস্কি বিরোধী পিআইএস শিবিরের ঘনিষ্ঠ। সংসদে নির্বাচিত কয়েক জন বিচারপতির নিয়োগের শপথ গ্রহণ করাতেও তিনি আপত্তি জানিয়েছেন। অন্য দিকে, আদালতের বর্তমান প্রধানও নতুন সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার নির্বাচিত বিচারপতিদের দায়িত্ব নিতে বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ।
ফলে একই আদালতের নেতৃত্ব এবং বিচারপতিদের একাংশের মধ্যে কে বৈধ, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। আদালতের দুই পক্ষই পরস্পরের সিদ্ধান্তের বৈধতা অস্বীকার করছে। এই সংঘাতের প্রভাব শুধু বিচারব্যবস্থায় সীমাবদ্ধ থাকছে না, ছড়িয়ে পড়ছে দেশের রাজনৈতিক পরিসরেও। আগামী বছর পোল্যান্ডে সংসদীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগে এই সাংবিধানিক সঙ্কট আরও বড় রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।




