নয়াদিল্লি: দান-খয়রাতের ক্ষেত্র বদলাচ্ছেন তাঁরা—২০২৫ সালের শেষ দিকে এমনই ঘোষণা করেছিলেন মেটা কর্ণধার মার্ক জুকারবার্গ এবং তাঁর স্ত্রী প্রিসিলা চ্যান। চিকিৎসাবিজ্ঞান, বিশেষত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-নির্ভর গবেষণায় আরও বেশি জোর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাঁদের দাতব্য সংস্থা ‘চ্যান জুকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ’ (সিজ়েডআই)। সেই ঘোষণার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকাঠামো উন্নয়নে ৫০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিল মেটা। লক্ষ্য, পুরনো সরকারি ভবনের সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে তৈরি করা নতুন ক্যাম্পাস, ছাত্রাবাস এবং অত্যাধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাকেন্দ্র।
ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম গত ২৮ জানুয়ারি এই অনুদানের কথা ঘোষণা করেন। স্যাক্রামেন্টো স্টেট ইউনিভার্সিটির জন্য দেওয়া এই অর্থ মূলত শহরের ক্যাপিটল মলে অবস্থিত তিনটি পরিত্যক্ত সরকারি ভবনের পুনর্বিকাশের কাজে লাগানো হবে। ভবনগুলিতে বিপজ্জনক পদার্থ অপসারণ, ভাঙার কাজ এবং নতুন নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ের খরচ মেটাতে ব্যবহার করা হবে অনুদানের টাকা। পরে সেখানে তৈরি হবে পড়ুয়াদের থাকার জায়গা, শিক্ষকদের জন্য পরিকাঠামো, আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাগার এবং একটি বিশেষ এআই কেন্দ্র।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নতুন ক্যাম্পাসের পরিকল্পনা শুধু শিক্ষার পরিসর বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের জন্য দক্ষ কর্মী তৈরির ক্ষেত্রে এই পরিকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
জুকারবার্গের এই অনুদানের তাৎপর্য আরও বেড়েছে তাঁর দাতব্য সংস্থার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের কারণে।
২০২৫ সালের শেষ দিকে জুকারবার্গ ও প্রিসিলা জানিয়েছিলেন, তাঁদের সংস্থার অধিকাংশ দাতব্য কাজের কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা গবেষণা এবং এআই-নির্ভর বিজ্ঞানচর্চা। বিশেষ গুরুত্ব পাবে ‘বায়োহাব’ প্রকল্প। এর মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে কোষের কার্যকলাপ বোঝা, রোগের পূর্বাভাস দেওয়া এবং রোগ প্রতিরোধের নতুন পদ্ধতি খোঁজার মতো গবেষণায় জোর দেওয়া হচ্ছে।
২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠার সময় সিজ়েডআই-এর লক্ষ্য ছিল শিক্ষা, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নের মতো একাধিক ক্ষেত্রে কাজ করা। সেই সময় জুকারবার্গ দম্পতি তাঁদের সম্পদের ৯৯ শতাংশ মানবকল্যাণে ব্যয় করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্থার অগ্রাধিকারে বদল এসেছে। এখন চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন, বিশেষ করে এআইয়ের সাহায্যে রোগ নির্ণয় এবং গবেষণার নতুন দিগন্ত খোঁজাই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
এখানেই মেটার ব্যবসায়িক পরিকল্পনার সঙ্গে জুকারবার্গের দাতব্য উদ্যোগের মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। মেটা নিজেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে। সংস্থার পরিকল্পনা, এআই-নির্ভর আরও উন্নত ব্যবস্থা তৈরি করা, যা সামাজিক মাধ্যমের ফিড, বিজ্ঞাপন এবং বাণিজ্যিক পরিষেবাকে আরও কার্যকর করে তুলবে। সেই লক্ষ্য পূরণে বিপুল সংখ্যক দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীর প্রয়োজন। স্যাক্রামেন্টো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে এআই কেন্দ্র এবং আধুনিক গবেষণাগার গড়ে উঠলে ভবিষ্যতে সেই দক্ষ কর্মী তৈরির পথও প্রশস্ত হতে পারে।
তবে এই অনুদানের পিছনে ক্যালিফোর্নিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় এসেছে। সে রাজ্যে ধনকুবেরদের সম্পদের উপর এককালীন ৫ শতাংশ কর বসানোর প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক চলছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে রাজ্যের একাধিক ধনকুবেরের উপর বিপুল করের বোঝা চাপতে পারে। এই আশঙ্কায় কয়েক জন ধনকুবের ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে অন্যত্র স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও খবর। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিন, ওরাকলের ল্যারি এলিসন এবং পেপ্যালের সহ-প্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েল।
জুকারবার্গ অবশ্য এই কর প্রস্তাব নিয়ে প্রকাশ্যে কোনও অবস্থান জানাননি। বরং তাঁর সংস্থার মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়ায় বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নতুন করে নজর কেড়েছে। এক দিকে মেটার এআই-এ বিপুল বিনিয়োগ, অন্য দিকে দাতব্য সংস্থার গবেষণার অগ্রাধিকারে বদল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলারের অনুদান—সব মিলিয়ে জুকারবার্গের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই যে ক্রমশ কেন্দ্রীয় জায়গা দখল করছে, তা স্পষ্ট।




