নয়াদিল্লি: দূষণের দাপটে দিল্লির বাতাস ক্রমশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে। ধোঁয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে রাজধানীর আকাশ। দূষিত বাতাসের প্রভাব যে শুধু ফুসফুস কিংবা শ্বাসযন্ত্রেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। চোখের উপরেও পড়ছে তার সরাসরি প্রভাব। চোখ লাল হয়ে যাওয়া, শুকনো ভাব, চুলকানি, জ্বালা কিংবা অনবরত জল পড়ার মতো সমস্যা নিয়ে ভুগছেন অনেকে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকলে চোখের স্বাভাবিক সুরক্ষাকবচ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যাঁদের আগে থেকেই চোখের শুষ্কতা বা অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
চোখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট করছে দূষণ
বাতাসে ভাসমান অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা, ধোঁয়া এবং বিভিন্ন রাসায়নিক গ্যাস চোখের উপরিভাগে সরাসরি আঘাত করে। যানবাহন, কলকারখানা এবং অন্যান্য দূষণের উৎস থেকে নির্গত পিএম ২.৫ ও পিএম ১০-এর মতো সূক্ষ্ম কণা চোখের সংবেদনশীল অংশে জমতে পারে। নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড এবং ওজোনের মতো গ্যাসও চোখে অস্বস্তি ও প্রদাহের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
চোখকে সুস্থ ও আর্দ্র রাখতে একটি পাতলা অশ্রুস্তর বা টিয়ার ফিল্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। এই স্তর চোখের উপরিভাগকে আর্দ্র রাখে, ধুলোবালি সরাতে সাহায্য করে এবং দৃষ্টিকে স্বচ্ছ রাখে। কিন্তু দূষিত বাতাস এই সুরক্ষাকবচের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। ফলে চোখের আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়। তৈরি হয় শুষ্কতা, জ্বালা এবং অস্বস্তি।
কোন লক্ষণগুলি অবহেলা করবেন না?
দূষণের কারণে চোখে একাধিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন—
১. চোখ লাল হয়ে যাওয়া: দূষণের কারণে চোখের উপরিভাগে প্রদাহ তৈরি হলে ছোট ছোট রক্তনালিগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে চোখ লাল দেখায়।
২. শুষ্কতা ও খচখচে ভাব: চোখের অশ্রুস্তরের ভারসাম্য নষ্ট হলে মনে হতে পারে, চোখের ভিতরে যেন বালি বা ধুলো আটকে রয়েছে।
৩. চুলকানি ও জ্বালা: বাতাসে ভাসমান দূষিত কণা চোখে অ্যালার্জি ও প্রদাহ বাড়িয়ে দিতে পারে। আগে থেকে অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।
৪. অনবরত জল পড়া: চোখে শুষ্কতা তৈরি হলেও প্রতিক্রিয়ায় অতিরিক্ত জল বেরোতে পারে। তাই চোখ দিয়ে জল পড়লেই যে চোখ যথেষ্ট আর্দ্র রয়েছে, এমন নয়।
৫. ঝাপসা দেখা: অশ্রুস্তরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হলে সাময়িক ভাবে দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে। বিশেষ করে বই পড়া কিংবা দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকার সময়ে সমস্যা বাড়তে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, যাঁদের আগে থেকেই ড্রাই আই বা চোখের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, দূষণের সময়ে তাঁদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বেশি। কারণ, লেন্সের আশপাশে ধূলিকণা ও দূষিত পদার্থ জমে চোখের উপরিভাগে অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া যাঁদের দিনের বেশির ভাগ সময় বাইরে কাটাতে হয়, তাঁরাও বেশি বিপদের মুখে। ট্রাফিক পুলিশ, ডেলিভারি কর্মী, নির্মাণশ্রমিক এবং রাস্তায় কাজ করা অন্য পেশার মানুষ দীর্ঘক্ষণ দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকেন। শিশু এবং বয়স্কদের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখে অশ্রু তৈরির পরিমাণ কমতে পারে। ফলে বয়স্কদের চোখ সহজেই শুষ্ক হয়ে পড়ে।
দূষণের প্রভাব কি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে?
অল্প সময় দূষিত বাতাসের সংস্পর্শে থাকার ফলে তৈরি হওয়া অস্বস্তি অনেক সময় দূষণ থেকে দূরে গেলে কমে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একই পরিস্থিতি চলতে থাকলে চোখের উপরিভাগে প্রদাহের সমস্যা বাড়তে পারে। আগে থেকে ড্রাই আই বা অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে তা আরও জটিল হতে পারে।
চোখের অস্বস্তির কারণে পড়াশোনা, কম্পিউটারে কাজ করা কিংবা গাড়ি চালানোর মতো দৈনন্দিন কাজেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। তবে চোখ লাল হওয়া বা চুলকানির পিছনে শুধু দূষণই দায়ী, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। সংক্রমণ, অ্যালার্জি এবং অন্য চোখের রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
চোখ বাঁচাতে কী করবেন?
দূষিত বাতাস থেকে চোখকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা কঠিন। তবে কয়েকটি নিয়ম মেনে চললে অস্বস্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বাতাসের গুণমান খারাপ থাকলে অপ্রয়োজনে বাইরে বেরোনো এড়িয়ে চলুন। বাইরে বেরোলে চোখ ঢেকে রাখে এমন চশমা বা সানগ্লাস ব্যবহার করুন। এতে ধুলো ও সরাসরি বাতাসের সংস্পর্শ কিছুটা কমে। চোখ চুলকালে ঘষবেন না। এতে প্রদাহ বাড়তে পারে এবং চোখের সংবেদনশীল অংশের ক্ষতি হতে পারে। চোখে শুষ্কতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রিজ়ারভেটিভ-মুক্ত কৃত্রিম অশ্রু বা লুব্রিকেটিং আই ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
কনট্যাক্ট লেন্স ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন। চোখে অস্বস্তি হলে লেন্স খুলে ফেলুন। বাইরে দূষণ বেশি থাকলে বাড়ির জানলা বন্ধ রাখুন এবং সম্ভব হলে উপযুক্ত এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করুন। বাইরে থেকে ফিরে মুখ ও চোখের পাতার চারপাশ পরিষ্কার জল দিয়ে আলতো করে ধুয়ে নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক, স্টেরয়েড বা চোখের লালচে ভাব কমানোর ওষুধ ব্যবহার করা উচিত নয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
চোখের সামান্য অস্বস্তি দূষণ থেকে দূরে থাকলে কমে যেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘদিন চোখ লাল থাকা, চুলকানি, জ্বালা কিংবা অনবরত জল পড়ার সমস্যা অবহেলা করা উচিত নয়। চোখে তীব্র ব্যথা, আলো সহ্য করতে না পারা, অতিরিক্ত ফোলা, ঘন স্রাব কিংবা দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে তা জরুরি চিকিৎসার বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষণের সঙ্গে লড়াইয়ে ফুসফুসের পাশাপাশি চোখের সুরক্ষার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, বিষাক্ত বাতাসের প্রভাব অনেক সময় প্রথমেই ধরা পড়ে চোখে। চোখের সামান্য অস্বস্তিকেও তাই ঋতু পরিবর্তনের স্বাভাবিক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।




