বিশেষ প্রতিবেদন: পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস নেই? তাতেও নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই। স্তনে কোনও উপসর্গ দেখা দেয়নি? তাতেও বিপদ পুরোপুরি এড়ানো যায় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে আনুমানিক ৬ লক্ষ ৯৪ হাজার মানুষের। আরও উদ্বেগের বিষয়, স্তন ক্যানসারের প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই নারী হওয়া এবং বয়স বাড়া ছাড়া অন্য কোনও নির্দিষ্ট ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত করা যায় না। ফলে শুধু পারিবারিক ইতিহাসের উপর নির্ভর করে এই রোগের ঝুঁকি বিচার করা বিপজ্জনক হতে পারে। রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করাই প্রাণ বাঁচানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
অক্টোবর স্তন ক্যানসার সচেতনতার মাস। এই সময়ে হু-র পরিসংখ্যান নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, স্তন ক্যানসার শুধু কোনও একটি দেশ বা নির্দিষ্ট বয়সের মানুষের সমস্যা নয়। ২০২৪ সালে বিশ্বে প্রায় ২৪ লক্ষ মহিলার এই রোগ ধরা পড়েছিল। ১৮৬টি দেশের মধ্যে ১৬৪টি দেশে মহিলাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্ণীত ক্যানসার ছিল স্তন ক্যানসার। অর্থাৎ, রোগটির ব্যাপকতা যেমন উদ্বেগজনক, তেমনই সময়মতো রোগ শনাক্ত করার প্রয়োজনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস নেই, তবু কেন সতর্ক থাকতে হবে?
স্তন ক্যানসার নিয়ে সাধারণ মানুষের অন্যতম ধারণা, পরিবারের কারও এই রোগ হয়ে থাকলেই অন্য সদস্যদের ঝুঁকি বেশি। পারিবারিক ইতিহাস অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। বিশেষ করে পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্যদের স্তন ক্যানসার হয়ে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। তবে পরিবারের কারও এই রোগ না থাকলেও স্তন ক্যানসার হতে পারে।
হু-র তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে নারী হওয়া এবং বয়স বাড়া ছাড়া অন্য কোনও পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকির কারণ থাকে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে এই রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এ ছাড়া স্থূলতা, মদ্যপান, তামাকের ব্যবহার, নির্দিষ্ট প্রজনন-সম্পর্কিত বিষয়, অতীতে বিকিরণের সংস্পর্শে আসা এবং মেনোপজের পরে হরমোন থেরাপির মতো বিষয়ও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে কোনও ঝুঁকির কারণ না থাকলেই যে স্তন ক্যানসার হবে না, এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্তনে কী কী পরিবর্তন দেখলে সতর্ক হবেন?
স্তন ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে সব সময় স্পষ্ট উপসর্গ দেখা যায় না। আবার স্তনে কোনও গাঁট মানেই ক্যানসার, এমনও নয়। কিন্তু নতুন কোনও পরিবর্তন দেখা গেলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্তন ক্যানসারের সম্ভাব্য লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে, স্তনে নতুন গাঁট বা কোনও অংশ অস্বাভাবিক মোটা হয়ে যাওয়া। স্তনের আকার বা আকৃতিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। স্তনের ত্বকে টান, গর্তের মতো দাগ, লালচে ভাব বা অন্য কোনও পরিবর্তন।
নিপল বা স্তনবৃন্তের অবস্থান কিংবা চেহারায় বদল। নিপল থেকে অস্বাভাবিক তরল বা রক্ত বেরোনো। বগলের কাছে নতুন গাঁট বা ফোলা ভাব। এই ধরনের কোনও পরিবর্তন চোখে পড়লে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। গাঁটে ব্যথা নেই বলে নিশ্চিন্ত থাকা ঠিক নয়। আবার প্রতিটি গাঁটকে ক্যানসার ভেবে আতঙ্কিত হওয়ারও কারণ নেই। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করেই রোগের প্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
নিজে পরীক্ষা করলেই কি ক্যানসার ধরা পড়বে?
স্তনের স্বাভাবিক গঠন ও চেহারা সম্পর্কে সচেতন থাকা গুরুত্বপূর্ণ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্তনের আকার, ত্বক ও নিপলের কোনও পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা লক্ষ করা যেতে পারে। স্নান করার সময় বা শুয়ে থাকা অবস্থায়ও স্তনের বিভিন্ন অংশে নতুন গাঁট কিংবা অস্বাভাবিক পরিবর্তন নজরে আসতে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। নিজে স্তন পরীক্ষা করা চিকিৎসকের পরীক্ষা বা প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিংয়ের বিকল্প নয়।
নিজের স্তনের স্বাভাবিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা থাকলে নতুন কোনও পরিবর্তন দ্রুত চোখে পড়তে পারে। কিন্তু শুধু নিজে পরীক্ষা করে স্তন ক্যানসার নিশ্চিত করা যায় না, কিংবা কোনও পরিবর্তন না পেলেই রোগ নেই বলে ধরে নেওয়া যায় না।
কোন বয়সে, কত ঘন ঘন এবং কী ধরনের পরীক্ষা প্রয়োজন, তা ব্যক্তির বয়স, ঝুঁকি ও চিকিৎসা-পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। হু-র তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা রয়েছে এমন পরিস্থিতিতে ৫০ থেকে ৬৯ বছর বয়সি মহিলাদের জন্য ম্যামোগ্রাফির মাধ্যমে স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পথ।
আগে ধরা পড়লে চিকিৎসার সুযোগ বাড়ে
স্তন ক্যানসারের ক্ষেত্রে রোগ শনাক্ত হওয়ার সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগটি ছোট অবস্থায় এবং আশপাশের লসিকাগ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ধরা পড়লে চিকিৎসার সাফল্যের সম্ভাবনা সাধারণত বেশি থাকে। রোগের ধরন ও পর্যায় অনুযায়ী অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।
হু-র লক্ষ্য, বিশ্বজুড়ে স্তন ক্যানসারে মৃত্যুর হার প্রতি বছর ২.৫ শতাংশ করে কমানো এবং ২০৪০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য ২৫ লক্ষ মৃত্যু এড়ানো। তার জন্য দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, নির্ণয়ের পরে সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা এবং রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পূর্ণ করার সুযোগ নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
স্তন ক্যানসার নিয়ে ভয়, লজ্জা বা ভুল ধারণার কারণে অনেকেই উপসর্গ দেখা দিলেও চিকিৎসকের কাছে যেতে দেরি করেন। কিন্তু দেরি না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে এই রোগের ইতিহাস থাকুক বা না থাকুক, স্তনে নতুন কোনও পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। সচেতনতা মানে শুধু নিজে পরীক্ষা করা নয়, শরীরের পরিবর্তন চিনতে শেখা, প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সময়মতো রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা করা। স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই পদক্ষেপগুলিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।




