নিউজ ডেস্ক: নিয়মিত জিমে গিয়ে ভারী ওজন তোলা, কয়েক কিলোমিটার দৌড়নো কিংবা ঘাম ঝরিয়ে শরীরচর্চা করা—সুস্থ থাকার জন্য এই অভ্যাসগুলি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শারীরিক সক্ষমতা কি শুধু পেশির জোর, সহনশক্তি কিংবা ওজনের কাঁটায় মাপা যায়? ধরুন, কেউ অনায়াসে ভারী ওজন তুলতে পারেন, আবার দীর্ঘক্ষণ দৌড়তেও তাঁর সমস্যা হয় না। অথচ সামনের দিকে ঝুঁকে পায়ের আঙুল ছুঁতে গেলেই পিঠে টান লাগে, কিংবা দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে বসে থাকার পর কোমর শক্ত হয়ে আসে। এমন অভিজ্ঞতা অস্বাভাবিক নয়।
আসলে নিয়মিত শরীরচর্চা করলেই যে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ সমান ভাবে নমনীয় হয়ে উঠবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। পেশির শক্তি ও সহনশক্তি বাড়লেও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সচলতা, ভারসাম্য এবং নিয়ন্ত্রিত ভাবে নড়াচড়া করার ক্ষমতার দিকে আলাদা করে নজর দেওয়া প্রয়োজন। আর সেখানেই নিয়মিত যোগাভ্যাসের গুরুত্ব উঠে আসছে।
শুধু শক্তি নয়, শরীরের সচলতাও জরুরি
শরীরচর্চার বিভিন্ন পদ্ধতি শরীরের বিভিন্ন ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। দৌড় হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কর্মক্ষমতা এবং সহনশক্তি বাড়ায়। ভারোত্তোলন পেশির শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। অন্য দিকে, যোগাভ্যাসে শরীরের নমনীয়তা, ভারসাম্য, নড়াচড়ার নিয়ন্ত্রণ এবং শ্বাসপ্রশ্বাসের উপর মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ থাকে।
এখানে দু’টি বিষয় আলাদা করে বোঝা দরকার—নমনীয়তা এবং সচলতা। নমনীয়তা বলতে মূলত পেশি ও অন্যান্য কলার প্রসারিত হওয়ার ক্ষমতাকে বোঝায়।
সচলতা হল কোনও সন্ধিকে তার স্বাভাবিক গতিসীমার মধ্যে নিয়ন্ত্রিত ভাবে নাড়াচাড়া করার সামর্থ্য। দৈনন্দিন জীবনে ঝুঁকে কোনও জিনিস তোলা, উঁচু তাকে রাখা জিনিস নামানো কিংবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার মতো কাজেও এই ক্ষমতাগুলি গুরুত্বপূর্ণ। যোগাসনের ধরন অনুযায়ী শরীরের বিভিন্ন পেশি ও সন্ধির উপর কাজ করা যায়। একই সঙ্গে শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে স্থির থাকার অনুশীলনও হয়। তবে প্রত্যেকের শারীরিক গঠন, বয়স, আগের শরীরচর্চার অভ্যাস এবং প্রশিক্ষণের ইতিহাস আলাদা। তাই কোনও একটি নির্দিষ্ট ভঙ্গি করতে পারা বা পায়ের আঙুল ছুঁতে পারাকেই সুস্থতার চূড়ান্ত মাপকাঠি ভাবা ঠিক নয়।
দৌড় ও জিমের সঙ্গে যোগাসনের সম্পর্ক কী?
দৌড়নো বা ভারোত্তোলনের অভ্যাস রয়েছে এমন অনেকের ক্ষেত্রেই যোগাভ্যাস অতিরিক্ত সুবিধা দিতে পারে। দীর্ঘক্ষণ দৌড়লে পায়ের পেশি, নিতম্ব এবং কোমরের আশপাশে টান অনুভূত হতে পারে। আবার জিমে নির্দিষ্ট ধরনের ব্যায়াম করতে করতে শরীরের কিছু পেশি বেশি সক্রিয় হলেও অন্য কিছু পেশির সচলতা ও নিয়ন্ত্রণের দিকে তুলনায় কম নজর পড়তে পারে।
যোগাসনের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশের নড়াচড়া, ভারসাম্য এবং পেশির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজ করা যায়। কিছু আসন নিতম্ব ও পায়ের পেশির নমনীয়তা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। আবার ভারসাম্য বজায় রাখার আসন শরীরের অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর অনুশীলন হিসেবে কাজে আসতে পারে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যোগব্যায়াম করলেই দৌড়ের গতি বেড়ে যাবে কিংবা চোট পাওয়ার আশঙ্কা সম্পূর্ণ দূর হবে, এমন দাবি করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। দৌড়বিদদের জন্য ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণের মাত্রা বাড়ানো, যথাযথ বিশ্রাম এবং পেশির শক্তি বাড়ানোর অনুশীলনও জরুরি। যোগাসন এই অভ্যাসগুলির পরিপূরক হতে পারে, বিকল্প নয়।
শ্বাসপ্রশ্বাসের উপর মনোযোগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যোগাভ্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শরীরের নড়াচড়ার সঙ্গে শ্বাসপ্রশ্বাসের সমন্বয়। সাধারণত জিমে কত ওজন তোলা গেল বা দৌড়ের সময় কতটা কমানো গেল, তার উপরই বেশি নজর থাকে। যোগাভ্যাসে এর পাশাপাশি শ্বাসের গতি, শরীরের অনুভূতি এবং কোনও ভঙ্গিতে কতটা স্বচ্ছন্দ থাকা যাচ্ছে, সেদিকেও মনোযোগ দেওয়া হয়। নিয়ন্ত্রিত ও ধীর শ্বাসপ্রশ্বাসের অনুশীলন অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমাতে এবং মন শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে।
নিয়মিত অনুশীলনে নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে নেওয়ার অভ্যাসও তৈরি হতে পারে। তবে শ্বাসের বিশেষ কৌশল সবার জন্য সমান উপযোগী নয়। মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট বা অস্বস্তি হলে অনুশীলন থামানো প্রয়োজন। জোর করে দীর্ঘক্ষণ শ্বাস আটকে রাখাও উচিত নয়। যোগাভ্যাসের উদ্দেশ্য শুধু কঠিন আসন আয়ত্ত করা নয়। শরীরের সামর্থ্য বুঝে, স্বাভাবিক শ্বাস বজায় রেখে এবং নিজের সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করে অনুশীলন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কোমর বা পিঠে ব্যথা থাকলে কি যোগাসনই সমাধান?
দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করার পর কোমর শক্ত হয়ে আসা কিংবা পিঠে অস্বস্তি অনুভব করার সমস্যা অনেকেরই রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কিছু মানুষের জন্য উপযুক্ত যোগাসন আরামদায়ক হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কোমরের ব্যথায় যোগাভ্যাসের সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। তবে ফলাফল ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে।
কোমরে ব্যথা হলেই নিজে থেকে কঠিন যোগাসন শুরু করা উচিত নয়। ব্যথার কারণ, শারীরিক অবস্থা এবং নড়াচড়ার সীমাবদ্ধতা বুঝে অনুশীলন বেছে নেওয়া প্রয়োজন। সাম্প্রতিক চোট, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা কিংবা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত ফিজিয়োথেরাপিস্টের পরামর্শ নিয়ে এগোনোই নিরাপদ।
বিশেষ করে কোনও আসন করার সময় তীব্র ব্যথা, ঝিনঝিন করা বা অস্বাভাবিক অস্বস্তি হলে জোর করে সেই ভঙ্গি ধরে রাখা উচিত নয়। নমনীয়তা বাড়ানোর জন্য শরীরকে ধীরে ধীরে অভ্যস্ত করতে হয়; জোর করে টান দিলে উল্টে সমস্যা বাড়তে পারে।
নতুনদের জন্য কোন পাঁচটি যোগাসন?
যোগাভ্যাস শুরু করতে হলে প্রথমেই কঠিন আসনের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রয়োজন নেই। সহজ ও তুলনায় নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি আসনের মাধ্যমে শুরু করা যেতে পারে। তবে কোনও আসনই সবার জন্য সমান উপযোগী নয়।
১. সুপ্ত পাদাঙ্গুষ্ঠাসন: চিত হয়ে শুয়ে একটি পা ধীরে ধীরে উপরে তোলার এই আসন পায়ের পিছনের পেশির নমনীয়তা বাড়ানোর অনুশীলনে কাজে আসতে পারে। প্রয়োজন হলে ফিতের সাহায্য নেওয়া যায়।
২. বৃক্ষাসন: এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর এই আসনে ভারসাম্য ও মনোযোগের অনুশীলন হয়। শুরুতে দেওয়াল বা মজবুত কোনও অবলম্বনের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।
৩. উত্তানাসন: দাঁড়িয়ে সামনের দিকে ঝোঁকার এই আসনে পায়ের পিছনের পেশিতে টান অনুভূত হয়। নমনীয়তা কম থাকলে হাঁটু সামান্য ভাঁজ করে রাখা যায়। হাত দিয়ে মেঝে ছোঁয়ার জন্য জোর করা উচিত নয়।
৪. ভুজঙ্গাসন: উপুড় হয়ে শুয়ে বুকের সামনের অংশ ধীরে ধীরে তোলার এই আসনে পিঠের পেশির সক্রিয়তা এবং মেরুদণ্ডের প্রসারণ নিয়ে কাজ করা হয়। কোমরে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে শরীর তোলা ঠিক নয়।
৫. করণী বা দেওয়ালে পা তুলে বিশ্রামের ভঙ্গি: দেওয়ালের সাহায্যে চিত হয়ে শুয়ে পা উপরে তুলে রাখার এই ভঙ্গি অনেকের কাছে আরামদায়ক হতে পারে। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে কাজ করার পর বিশ্রামের অনুশীলন হিসেবেও এটি করা যায়।
এই আসনগুলি শুরু করার আগে সঠিক পদ্ধতি জেনে নেওয়া জরুরি। কোনও ভঙ্গিতে অস্বস্তি হলে তার সহজ সংস্করণ বেছে নিতে হবে অথবা সেটি বাদ দিতে হবে।
শরীরচর্চার রুটিনে যোগাসন যোগ করবেন কী ভাবে?
যাঁরা নিয়মিত দৌড়ন বা জিমে যান, তাঁদের পুরো রুটিন বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। সপ্তাহে কয়েক দিন অল্প সময়ের জন্য সহজ যোগাসন, শরীরের সচলতা বাড়ানোর অনুশীলন এবং নিয়ন্ত্রিত শ্বাসপ্রশ্বাসের চর্চা দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে ধীরে ধীরে সময় বাড়ানো উচিত।
কঠিন দৌড় বা ভারী ওজন তোলার দিনের সঙ্গে অতিরিক্ত কঠিন যোগাসন জুড়ে দিলে ক্লান্তি বেড়ে যেতে পারে। তাই অনুশীলনের তীব্রতা, বিশ্রাম এবং শরীরের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার। নতুনদের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শেখা বিশেষ ভাবে উপকারী হতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, শরীরচর্চার সাফল্য শুধু কতটা ওজন তুলতে পারছেন, কত দ্রুত দৌড়চ্ছেন কিংবা কতটা ওজন কমেছে, তার উপর নির্ভর করে না। দৈনন্দিন কাজ কতটা স্বচ্ছন্দে করতে পারছেন, শরীরের ভারসাম্য কেমন, নড়াচড়ায় অস্বস্তি হচ্ছে কি না এবং পরিশ্রমের পর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছেন কি না—এসবও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই যোগাসন সবার ফিটনেস রুটিনের একমাত্র ‘হারানো যোগসূত্র’ না হলেও, যাঁদের শরীরচর্চা মূলত দৌড় বা পেশির শক্তি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ, তাঁদের জন্য এটি কার্যকর সংযোজন হতে পারে। লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শক্তিশালী শরীর নয়, বরং এমন শরীর গড়ে তোলা যা শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দৈনন্দিন জীবনে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করতে সক্ষম।
