বিশেষ প্রতিবেদন: ক্যানসারের চিকিৎসায় দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হল, আক্রান্ত কোষকে ধ্বংস করতে গিয়ে শরীরের সুস্থ কোষেরও ক্ষতি হয়ে যাওয়া। কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলাতে গিয়ে বহু রোগীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সেই সমস্যার মোকাবিলায় এ বার নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে গবেষণা। বিজ্ঞানীরা এমন একটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন, যার সাহায্যে টিউমারের ভিতরে পৌঁছে ক্যানসার প্রতিরোধী যৌগ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে অ্যালবুমিন নামের একটি প্রোটিন। রক্তে স্বাভাবিকভাবেই উপস্থিত থাকে অ্যালবুমিন। শরীরের বিভিন্ন অংশে নানা পদার্থ পরিবহণের ক্ষেত্রে এই প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানীরা সেই বৈশিষ্ট্যকেই কাজে লাগিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা করছেন, যা ক্যানসার আক্রান্ত কোষের কাছে ওষুধের উপাদান পৌঁছে দিতে পারবে। লক্ষ্য, টিউমারের ভিতরে নির্দিষ্ট রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যানসার প্রতিরোধী যৌগ তৈরি করা, যাতে সুস্থ কোষের উপর অপ্রয়োজনীয় প্রভাব যথাসম্ভব কমানো যায়।
কী ভাবে কাজ করবে এই পদ্ধতি?
ক্যানসারের চিকিৎসায় ওষুধ ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত চিকিৎসার ক্ষেত্রে ওষুধ শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে ক্যানসার কোষের পাশাপাশি কিছু সুস্থ কোষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অ্যালবুমিন-ভিত্তিক ওষুধ পরিবহণ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হল, এই সমস্যাকে অনেকটা কমিয়ে আনা। অ্যালবুমিনকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করে ক্যানসার প্রতিরোধী উপাদান টিউমারের কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন গবেষকেরা।
নির্দিষ্ট পরিবেশে সেই উপাদান সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে অথবা ক্যানসার প্রতিরোধী যৌগ তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে সরাসরি টিউমারকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা করা সম্ভব হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এই ধরনের গবেষণায় অ্যালবুমিনের ভূমিকা শুধু ওষুধ বহন করাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ওষুধের স্থায়িত্ব বাড়ানো, শরীরে তার পরিবহণের সময় বৃদ্ধি করা এবং টিউমারে ওষুধ পৌঁছনোর সম্ভাবনা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও অ্যালবুমিন-ভিত্তিক ব্যবস্থার উপযোগিতা নিয়ে গবেষণা চলছে।
কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি কমবে?
কেমোথেরাপি এখনও বহু ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই চিকিৎসায় বমি বমি ভাব, ক্লান্তি, চুল পড়া, মুখে ঘা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। ওষুধের ধরন, মাত্রা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তীব্রতা বদলায়।
সেই কারণেই ক্যানসার কোষকে আরও নির্দিষ্টভাবে নিশানা করার পদ্ধতি নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ বাড়ছে। অ্যালবুমিন-ভিত্তিক ব্যবস্থার সাহায্যে যদি টিউমারে ওষুধের ঘনত্ব বাড়ানো যায় এবং সুস্থ কোষে তার প্রভাব কমানো সম্ভব হয়, তা হলে চিকিৎসার সহনশীলতা বাড়তে পারে। তবে এই সম্ভাবনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে গবেষণার ফল এবং পরবর্তী পরীক্ষার উপর।
এখনই কি ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা যাবে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা। গবেষণাগারে কোনও পদ্ধতি কার্যকর মনে হওয়া আর মানুষের শরীরে তা নিরাপদ ও সফলভাবে কাজ করা এক বিষয় নয়। নতুন ওষুধ বা ওষুধ পরিবহণের পদ্ধতিকে রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করার আগে তার কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, সঠিক মাত্রা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত পরীক্ষা প্রয়োজন।
অ্যালবুমিন-ভিত্তিক ক্যানসার চিকিৎসা নিয়ে ইতিমধ্যেই নানা ধরনের গবেষণা হয়েছে। কিছু অ্যালবুমিন-নির্ভর ওষুধও নির্দিষ্ট ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। কিন্তু নতুন কোনও পদ্ধতির ক্ষেত্রে তার নিজস্ব পরীক্ষার ফলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই গবেষণাকে এখনই ক্যানসার নিরাময়ের নতুন দিশা বা প্রচলিত কেমোথেরাপির বিকল্প বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
তবে টিউমারের ভিতরে ওষুধের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং সুস্থ কোষের ক্ষতি কমানোর চেষ্টা ক্যানসার গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সেই লক্ষ্যে অ্যালবুমিনকে কাজে লাগানোর এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও নির্দিষ্ট ও সহনীয় চিকিৎসাপদ্ধতি তৈরির সম্ভাবনা তৈরি করছে।




