বিশেষ প্রতিবেদন: ডায়াবিটিস ধরা পড়ার পরেই অনেকের প্রথম সিদ্ধান্ত—ভাত কমাতে হবে, রুটি খাওয়া যাবে না। কারও পাতে ভাতের পরিমাণ কমে চার চামচ, কারও আবার রাতের খাবার থেকে ভাত পুরোপুরি উধাও। কিন্তু তার পরেও রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ছে কেন? চিকিৎসকদের মতে, এর উত্তর লুকিয়ে থাকতে পারে ভাতের বাইরের খাবারেই। আলুর তরকারি, চিঁড়ে, মুড়ি, বিস্কুট, মিষ্টি চা কিংবা ফলের রস—দিনভর খাওয়া এই খাবারগুলিও শরীরে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
ফলে শুধু ভাত বা রুটি কমিয়ে দিলেই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণে খাবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনও একটি খাবারকে একমাত্র দায়ী করে বাকি খাদ্যাভ্যাস উপেক্ষা করলে সমস্যা থেকেই যেতে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, কী খাওয়া হচ্ছে, কতটা খাওয়া হচ্ছে এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে কী কী খাবার শরীরে যাচ্ছে—সব কিছুর হিসাব রাখা জরুরি।
ভাত কমিয়েও বাড়ছে সুগার, কোথায় ভুল?
ডায়াবিটিস রোগীদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা রয়েছে, ভাত ও রুটি কমালেই রক্তে শর্করার মাত্রা কমবে। অথচ ভাতের বদলে অন্য কোনও শর্করাজাতীয় খাবার বেশি পরিমাণে খেলে মোট কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের পরিমাণ কমে না। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রাও প্রত্যাশামতো নাও কমতে পারে। ধরা যাক, কেউ রাতের খাবারে ভাত খাওয়া বন্ধ করে তার বদলে দু’বাটি সবজি দেওয়া চিঁড়ে খেলেন।
চিঁড়ে তুলনায় হালকা খাবার বলে মনে হলেও, তার মধ্যে কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। পরিমাণ বেশি হলে সেই খাবার থেকেও রক্তে শর্করা বাড়তে পারে। একই কথা প্রযোজ্য ওটস, ডালিয়া, রাগি, বাজরা বা অন্যান্য মিলেটের ক্ষেত্রেও। এই খাবারগুলির মধ্যে ফাইবার ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকতে পারে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ইচ্ছেমতো খাওয়া যাবে। খাবারের ধরন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ পরিমাণ।
আলু, চিঁড়ে, মুড়িতেও নজর
ভাত ও গমের পাশাপাশি আলু, মিষ্টি আলু, ভুট্টা, সাবুদানা, পাউরুটি, নুডলস, চিঁড়ে, উপমা, ইডলি ও ধোসার মতো খাবারেও কার্বোহাইড্রেট থাকে। দুধ, ফল, ডাল ও বিনসেও কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। তবে এই খাবারগুলির পুষ্টিগুণ এক নয়। ডাল ও বিনসের মতো খাবার প্রোটিন ও ফাইবারও সরবরাহ করে। তাই সব খাবারকে একই ভাবে বাদ দেওয়ার বদলে সামগ্রিক খাদ্যতালিকার ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
সমস্যা তৈরি করতে পারে খাবারের সঙ্গে নেওয়া অতিরিক্ত পদও। ভাত কমিয়ে তার সঙ্গে বেশি আলুর তরকারি খাওয়া, চায়ের সঙ্গে বারবার বিস্কুট খাওয়া কিংবা বিকেলে মুড়ি-নমকিনের বড় বাটি শেষ করে ফেলা—এসব অভ্যাসে দিনের মোট কার্বোহাইড্রেট ও ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ‘স্বাস্থ্যকর’ বলে পরিচিত খাবারও অতিরিক্ত খেলে সমস্যা হতে পারে। যেমন, মাখানা বা মিলেটের তৈরি খাবারে পুষ্টিগুণ থাকলেও সেগুলির পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। রান্নায় বেশি ঘি বা তেল ব্যবহার করলে ক্যালরির পরিমাণও বেড়ে যায়।
ফলের রস ও মিষ্টি চা-ও বাড়াতে পারে শর্করা
অনেকেই খাবারের হিসাব রাখেন, কিন্তু পানীয়ের কথা ভুলে যান। অথচ ফলের রস, মিষ্টি লস্যি, ফ্লেভার দেওয়া দই, মিল্কশেক এবং বারবার চিনি দেওয়া চা খেলে শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে শর্করা প্রবেশ করতে পারে। আস্ত ফল খাওয়ার তুলনায় ফলের রস দ্রুত পান করা যায়। ফলে অল্প সময়ে অনেকটা ফলের শর্করা শরীরে চলে যেতে পারে। রস তৈরির সময় ফলের আঁশের কাঠামোও ভেঙে যায়। তাই সাধারণ ভাবে ফলের রসের বদলে পরিমিত পরিমাণে গোটা ফল খাওয়াই বেশি উপযোগী।
চিনি ছাড়া বিকল্প হিসেবে অনেকে মধু, গুড় বা ব্রাউন সুগার ব্যবহার করেন। কিন্তু এগুলিও শর্করার উৎস। শুধু চিনির রং বা উৎস বদলালেই রক্তে শর্করার উপর তার প্রভাব বদলে যায় না। একই ভাবে, কোনও প্যাকেটজাত খাবারে ‘নো অ্যাডেড সুগার’, ‘মাল্টিগ্রেন’ বা ‘ডায়াবিটিসের জন্য উপযোগী’ লেখা থাকলেই সেটি নিশ্চিন্তে খাওয়া যায় না। খাবারের প্যাকেটে মোট কার্বোহাইড্রেট, উপাদান এবং প্রতি পরিবেশনের পরিমাণ দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
খাবারের পাশাপাশি ঘুম, মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ
রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ার পিছনে শুধু খাদ্যাভ্যাসই দায়ী নয়। টাইপ-২ ডায়াবিটিসের ক্ষেত্রে সময়ের সঙ্গে অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরির ক্ষমতা কমতে পারে। ফলে আগে যে পরিমাণ খাবার খেয়েও শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকত, পরে একই খাবারে রক্তে শর্করা বেড়ে যেতে পারে। রাতের ঘুমের ব্যাঘাত, মানসিক চাপ, সংক্রমণ, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং কিছু ওষুধও রক্তে শর্করার মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে। ওজন বেড়ে গেলে শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
কেউ যদি নিয়মিত ওষুধ না খান, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা কমিয়ে দেন কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পর্যালোচনা না করান, তা হলেও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে। তাই সুগার বাড়লেই আরও বেশি খাবার বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজনে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে ওষুধ ও চিকিৎসার পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা দরকার।
পাতে কী থাকবে? সহজ হিসাব
খাদ্যতালিকার ভারসাম্য বজায় রাখতে একটি সহজ পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। সাধারণ ভাবে, পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবারের প্লেটকে তিন ভাগে সাজানো যায়—অর্ধেক প্লেট: কম শ্বেতসারযুক্ত সবজি। এক-চতুর্থাংশ: প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার—যেমন ডাল, টক দই, পনির, ডিম, মাছ বা মুরগির মাংস।
বাকি এক-চতুর্থাংশ: ভাত, রুটি বা অন্য কোনও শস্যজাতীয় খাবার। এটি একটি সাধারণ নির্দেশিকা, সবার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম নয়। বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, ডায়াবিটিসের ধরন, ওষুধ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার ভিত্তিতে খাবারের পরিমাণ বদলাতে পারে। তাই ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তিন দিনের খাবারের হিসাব রাখুন
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না এলে চিকিৎসকের পরামর্শে কয়েক দিনের খাবারের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। কখন কী খাওয়া হচ্ছে, আনুমানিক পরিমাণ কত, কখন ওষুধ নেওয়া হচ্ছে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা কত—এই তথ্যগুলি নথিভুক্ত করলে সমস্যার কারণ চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে।
অনেক সময় দেখা যায়, দুপুর ও রাতের খাবারে ভাত কমানো হলেও সকালের চায়ের সঙ্গে বিস্কুট, বিকেলের নমকিন কিংবা রাতের খাবারের পরে অতিরিক্ত ফল খাওয়ার অভ্যাস থেকে যাচ্ছে। আবার কোথাও খাবারের পরিমাণ ঠিক থাকলেও ওষুধের সময়, ঘুম বা শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতি সমস্যার কারণ হতে পারে।
মূল কথা, ডায়াবিটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য ভাত বা রুটি পুরোপুরি বাদ দেওয়াই একমাত্র পথ নয়। সারাদিনে মোট কতটা কার্বোহাইড্রেট খাওয়া হচ্ছে, তার সঙ্গে প্রোটিন ও সবজির ভারসাম্য কেমন, শারীরিক সক্রিয়তা কতটা এবং চিকিৎসা ঠিকমতো চলছে কি না—সব কিছুর উপরেই নজর দেওয়া প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ করা বা অত্যন্ত কঠোর খাদ্যনিয়ম শুরু করার বদলে, নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণের পথে এগোনো উচিত।




