নিউজ ডেস্ক: রাতে শাড়িতে লাগত চোরকাঁটা, মন্দির থেকে একাই ঘুরে বেড়াতেন দেবী! বীরভূমের আকালীপুরের মা গুহ্য কালীর রোমহর্ষক ও অলৌকিক ইতিহাস!
বীরভূম জেলার ভদ্রপুর সংলগ্ন ব্রাহ্মণী নদীর তীরে অবস্থিত আকালীপুরের মা গুহ্য কালীর মন্দির। তারাপীঠের কাছাকাছি অবস্থিত এই ঐতিহাসিক সিদ্ধপীঠকে ঘিরে রয়েছে এমন কিছু অলৌকিক লোককথা ও ইতিহাস, যা শুনলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। মনে করা হয়, এই দেবীমূর্তি প্রায় ৩০০০ বছরের প্রাচীন এবং স্বয়ং মহাভারতের কালজয়ী চরিত্র মগধরাজ জরাসন্ধের ইষ্টদেবী ছিলেন!
প্রাচীন কিংবদন্তি, জরাসন্ধের পাতালে সাধনা থেকে শুরু করে কাশীর রাজার আমলে মাটি খুঁড়ে দেবীমূর্তি আবিষ্কার—সব মিলিয়ে এই কালীক্ষেত্রকে ঘিরে রয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনি। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, মহাভারতের যুগে মগধের রাজা জরাসন্ধ অত্যন্ত গোপনে মাটির নিচে গর্ভগৃহ তৈরি করে এই গুহ্য কালীর আরাধনা করতেন। জরাসন্ধের মৃত্যুর পর বহু যুগ ধরে এই মূর্তি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। পরবর্তীকালে কাশীর রাজা চৈত সিংয়ের আমলে এক কৃষক মাটির নিচে জলের সন্ধান করতে গিয়ে অলৌকিক উপায়ে এই বিরল মূর্তিটির সন্ধান পান।
ইংরেজ গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস যখন এই অপূর্ব কষ্টিপাথরের মূর্তিটির কথা জানতে পারেন, তখন তিনি সেটি ইংল্যান্ডের কোনও সংগ্রহশালায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু দেবীমূর্তিকে রক্ষা করতে কাশীর রাজা চৈত সিং সেটিকে গঙ্গার গর্ভে লুকিয়ে ফেলেন এবং প্রচার করেন যে মূর্তিটি চুরি হয়ে গিয়েছে। পরবর্তীকালে ১৭৭৫ সালে বাংলার বীর সন্তান মহারাজা নন্দকুমার স্বপ্নাদেশ পেয়ে গঙ্গার বুক থেকে দেবীমূর্তিটি উদ্ধার করেন। এরপর বীরভূমের আকালীপুরে এনে পঞ্চমুণ্ডির আসনের উপর এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
রাতের আঁধারে দেবীর পরিভ্রমণ: এই মন্দিরকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে আরও এক রহস্যময় লোককথা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, অতীতে গভীর রাতে দেবী নিজেই মন্দির প্রাঙ্গণ ছেড়ে বাইরে ঘুরে বেড়াতেন। এর প্রমাণ হিসেবে পরদিন সকালে দেবীর পরিহিত রাজকীয় শাড়ির নিচে প্রচুর 'চোরকাঁটা' অর্থাৎ এক ধরনের ঘাসের বীজ লেগে থাকতে দেখা যেত।
এখানে দেবী শাবকের উপর আসীন। সাধারণ কালীমূর্তির মতো মা গুহ্য কালী শিবের বুকে দাঁড়িয়ে নেই। প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণবর্ণের কষ্টিপাথরের দেবীমূর্তিটি অনন্তনাগ বা সর্পশয্যার উপর শায়িত শিবের নাভিদেশ থেকে নির্গত পদ্মের উপর উপবিষ্ট। দেবীর কণ্ঠে রয়েছে নরমুণ্ডমালা এবং তিনি দ্বিভুজা।
ভোগের নিয়মেও এই মন্দিরের বিশেষত্ব রয়েছে। এখানে মাকে নিবেদিত বিশেষ ভোগের প্রসাদ কোনও অবস্থাতেই কেউ বাড়িতে নিয়ে যেতে পারেন না। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রসাদ মন্দিরের বাইরের খোলা মাঠে বা প্রাঙ্গণেই বসে খেয়ে শেষ করতে হয়।
যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা অলৌকিক বিশ্বাস ও ইতিহাস আজও বীরভূমের আকালীপুরের এই প্রাচীন মন্দিরকে এক বিশেষ মাহাত্ম্য দিয়েছে। প্রতি বছর দীপান্বিতা কালীপুজোয় এখানে তান্ত্রিক মতে মহাসমারোহে মা গুহ্য কালীর পুজো অনুষ্ঠিত হয়।




