নিউজ ডেস্ক: হুগলির রাজবলহাটে পৌঁছলে আজকের সাধারণ জনপদের আড়ালে যেন অন্য এক বাংলার দরজা খুলে যায়। হুগলির জাঙ্গিপাড়া অঞ্চলের এই জনপদ একসময় ভূরিশ্রেষ্ঠ বা ভুরশুট রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বলে ঐতিহ্যে পরিচিত। রাজবলহাটের নামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজবল্লভী দেবীর স্মৃতি। কিংবদন্তি অনুসারে, রাজা সদানন্দ রায় শিকারে প্রাণীহত্যার জন্য অনুতপ্ত হয়ে গুরুর নির্দেশে অরণ্যে শক্তিসাধনায় ব্রতী হন। সাধনাকালে তাঁর সামনে আবির্ভূতা হন শুভ্রবর্ণা দ্বিভূজা দেবী। দেবী তাঁকে নিজের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে রাজ্যপালনে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ, আঁটপুরের ঐতিহাসিক বিবরণেও রাজবল্লভীর প্রাচীন ঐতিহ্যের উল্লেখ রয়েছে। মন্দিরটির নির্মাণকাল নিয়ে ভিন্ন মত থাকলেও অনেক গবেষণা ও স্থানীয় ঐতিহ্যে ষোড়শ শতকে রাজা রুদ্রনারায়ণ রায়ের নির্মাণের কথা বলা হয়।
লোকঐতিহ্য অনুযায়ী, দেবীর নিত্যভোগের জন্য জেলে, তাঁতি, কুমোর ও গোয়ালাদের বসতি গড়ে ওঠে মন্দিরকে কেন্দ্র করে। আজ রাজবল্লভী বাংলার অন্যতম অনন্য ‘শ্বেত কালী’। প্রায় ছয় ফুট উচ্চতার এই ত্রিনয়নী দেবীর ডান হাতে ছুরিকা, বাম হাতে রুধিরপাত্র, গলায় মুণ্ডমালা এবং কোমরে মানুষের হাতের অলংকার। তাঁর ডান পদ মহাকালের বুকে এবং বাঁ পদ বিরূপাক্ষ শিবের মস্তকে স্থাপিত। শুভ্রবর্ণা এই দেবীর রূপ প্রচলিত দক্ষিণাকালী বা শ্যামাকালীর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
দেবীকে ঘিরে প্রচলিত আরেক কিংবদন্তিতে রয়েছে এক অচেনা বালিকার কথা। কথিত আছে, এক সওদাগর সপ্তডিঙা নিয়ে নদীপথে যাওয়ার সময় বালিকাটিকে নৌকায় তুলতে চাইলে একের পর এক ছয়টি নৌকা ডুবে যায়। সপ্তম নৌকায় ওঠার সময় দৈববাণী ঘোষণা করে, বালিকা স্বয়ং ভগবতী। সেই স্মৃতিতে আজও দেবীর পুকুরে সাতটি ছোট কাঠের নৌকা ভাসিয়ে ছয়টি ডুবিয়ে সপ্তমটি ভাসিয়ে রাখার রীতি রয়েছে।
রাজবল্লভীর দুর্গাপুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য প্রাচীন জলঘড়ি, যার সাহায্যে একসময় পুজোর গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত নির্ধারণ করা হতো। দেবীর ভোগে ভাত, ডাল, মাছের অম্বল, পায়েস, লুচি ও সন্দেশের মতো খাবার থাকে। প্রচলিত মতে, নির্দিষ্ট ব্যবধানে গঙ্গামাটি ও গঙ্গাজল দিয়ে নতুন বিগ্রহ নির্মাণ করে অক্ষয় তৃতীয়ায় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। মন্দিরের নহবতখানা, দেউড়ি, নাটমন্দির ও শিবমন্দির আজও অতীতের স্মৃতি বহন করে। রাজবলহাটের রাজবল্লভী তাই শুধু দেবী উপাসনার কেন্দ্র নয়; বাংলার লোকবিশ্বাস, শক্তিসাধনা, রাজশক্তি, নদীপথের বাণিজ্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অনন্য ঐতিহ্য।




